আপেল বসুনীয়া, চিলাহাটি ওয়েব : ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু ছিল। এ পথে ভারতের দার্জিলিং থেকে খুলনা ও কলকাতা পর্যন্ত একাধিক যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করতো।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় এ রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘ ৫৫ বছর পর ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর পুনরায় চালু করা হয় চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথ। এর আগে ২০১৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের অংশে নতুন করে রেলপথ নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
চিলাহাটি থেকে ভারতের সীমান্ত পর্যন্ত ৯ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। এর মধ্যে ২ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার লুপলাইন রয়েছে।
সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণ, চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের আইকনিক ভবন এবং স্টেশন থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সচল রাখার লক্ষ্যে রেললাইন ও অবকাঠামো স্থাপনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা। তবে রেল যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরও দীর্ঘদিন এ পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত রেললাইন, ইয়ার্ড, আন্তর্জাতিক টার্মিনাল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
একদিকে সরকারি সম্পদের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে সীমান্ত বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ করা স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম দুর্ভোগে।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার রুহুল আমিন জানান, চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে ট্রেন চলাচল চালু ছিল।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর (৫ আগস্ট) এ পথে রেল যোগাযোগ আবার বন্ধ হয়ে যায়। তবে দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে পুনরায় ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। কবে নাগাদ ট্রেন চলাচল শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তারিখ জানানো হয়নি।
এলাকার বাসিন্দা রুবাইয়া হোসেন ডন জানান, দেশভাগের পর চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এলাকার উন্নয়ন এবং দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে পুনরায় এ রেলপথ চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের পর ২৫ জুন আবারও তা বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, এ পথে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের পাশাপাশি শত শত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বদলে যাবে নীলফামারীসহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান। বাড়বে সরকারের রাজস্ব আয়। এ কারণে দুই দেশের সরকারের আলোচনার মাধ্যমে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল মান্নান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রডগেজ রেললাইন ও ইয়ার্ড দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় সেগুলোতে মরিচা ধরছে। প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল, কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবনও পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এ ছাড়া প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওভারব্রিজ ও সংযোগ সড়ক ব্যবহার না হওয়ায় বর্ষার পানি এবং শুষ্ক মৌসুমের ধুলোবালিতে নষ্ট হতে বসেছে।
অন্যদিকে, রেলপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনের রাজস্ব আয় কমেছে। দুই বছরের ব্যবধানে মাসিক রাজস্ব আয় প্রায় এক কোটি টাকা থেকে কমে ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকারি আয়ের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও স্থবির হয়ে পড়েছে।
সীমান্ত বাণিজ্য চালুর আশায় ব্যাংকঋণ নিয়ে পরিবহন, আবাসিক হোটেল, উন্নতমানের খাবারের হোটেল এবং ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলেন স্থানীয় অনেক তরুণ উদ্যোক্তা। কিন্তু রেলপথে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে।
চিলাহাটি আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রস্তাবনা পরিষদের সভাপতি আহসানুল কবির বসুনিয়া বলেন, নীলফামারীসহ গোটা উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেল যোগাযোগ চালু করা হয়েছিল। গত ২৫ জুন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর এ পথে রেল যোগাযোগ আবার বন্ধ হয়ে যায়। দুই দেশের মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক হুমায়ূন কবীর জানান, রেলের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। তবে বন্দর ও রেলপথ পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত পুরোপুরি সরকার এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভরশীল।
এ কারণে বিষয়টি সময় সাপেক্ষ। তবে দুই দেশের সরকারের এ পথে পুনরায় যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।







