Home » , » কিশোরগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে চটুল সুরের দুলাল কবি কন্ঠে কাওয়ালী গান

কিশোরগঞ্জে হারিয়ে যাচ্ছে চটুল সুরের দুলাল কবি কন্ঠে কাওয়ালী গান

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 30 August, 2020 | 2:00:00 PM


মিজানুর রহমান,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি,চিলাহাটি ওয়েব : "আমার রঙের বিয়ার কয়দিন আছে বাকী ও সখী গো আমার রঙের বিয়ার কয়দিন আছে বাকি যেদিন বিয়ার হবে দিবস কাঠুনি আর কাঞ্চারে বাঁশ আতর গোলাপ করবে মাখামাখি" দুলাল কবি কণ্ঠে দেহতাত্ত্বিক এই গানের স্বকীয়তা আজ হারাতে বসেছে।
নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের নিতাই বাড়ি মধুপুর গ্রামের দুলাল হোসেন( ৫৫) স্কুলজীবনে শখের বশে যোগ দিয়েছিলেন কাওয়ালি গানে। খুদে গায়ক থেকে হয়ে ওঠেন একজন প্রথিতযশা কাওয়ালী গানের মাধুর্য কন্ঠের সম্রাট। শমসের কবির হাতে খড়ি দুলাল থেকে হয়ে ওঠেন দুলাল কবি। এক সময়ে এ জনপদের অতি জনপ্রিয় কবি (কাওয়ালী) গানের মাধ্যমে তিনি মাটি ও মানুষের মন জয় করে নিয়ে ছিলেন।
কৃষাণ-কৃষাণীরাও সারাদিন মাঠে হাল চাষসহ গৃহস্থলি কাজ সাঙ্গ করে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমী জীবনের প্রশান্তি খুজে পেতে সন্ধ্যা হলে ফিরত ( কাওয়ালী) গানের আসরে । যে গানের মাধ্যমে গ্রামের মাটি ও মানুষেরা খুঁজে পেত তাদের দৈনন্দিন জীবনের সুখ -দুঃখ। সন্ধ্যা হলেই মেঠো পথের গ্রাম -মহল্লায় খোলা আকাশের নিচে বা চার কোনায় চারটি খুটির মাথায় টিন তুলে দিয়ে তার নিচে মঞ্চ সাজানো হত। মঞ্চের চারিপাশে শপ, পার্টি খরকুটো পেতে গ্রামের ছোট বড় সকল বয়সী নারী ও পুরুষ সহ হাজারো মানুষের ঢল আর উৎসুক জনতার ভিড়ে নিদ্রাহীন ভাবে জমজমাট ভাবে দু"জন গায়কের তর্ক আর বিতর্কে, ছন্দ- সুরে পরিবেশিত হত নারী-পুরুষ, আদম-হাওয়া, দুনিয়া সৃষ্টি ধ্বংস, শরীয়ত- মারফত আল্লাহ- রাসুল ইত্যাদি বিষয়ে তত্ত্বাশ্রিত কাহিনি অবলম্বনে ওই (কাওয়ালী) গানের আসর।
হারমোনিয়াম আর ঢোল -ঢাক গলায় ঝুলিয়ে গাইত এসব গান। শ্রোতারা উপভোগ করতো মা -মাটি মানুষের গান। আর অর্জন করত জ্ঞান। কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির আঁধারে বাঙালির শিকড়ের এককালীন বিনোদনের প্রধান অনুষঙ্গ কাওয়ালী গানের আসর। অনাদর, অবহেলায় মরতে বসেছে কাওয়ালী গান। গোলাভরা ধান আর গলায় গলায় গান প্রবাদটি এখন কথার কথা। ক্ষেত নিড়ানির কৃষান-কৃষাণীদের খালি গলায় সারি সারি গান আর আগের মত শোনা যায়না। গ্রাম গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে সাউন্ড সিস্টেম আর ব্যান্ড যন্ত্রের সমারোহ। ফলে আগে যে কাওয়ালী গান হত সেগুলো এখন আর হয় না। বর্তমান প্রজন্ম এর সাথে পরিচিত না থাকলেও প্রবীণরা আজও খুঁজে ফেরে একসময়ের এসব গানের আসর। ক্ষেত খামারে যারা কাজ করে তারাওএখন মোবাইলে সিনেমার চটুল গান শুনে।
হাতের মুঠোয় বিনোদনের সহজলভ্যতা, ইউটিউব এর ব্যবহার, ক্যাবল নেটওয়ার্ক এর ছড়াছড়ি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, জুয়ার আবর্তে পড়ে বাঙালির প্রাচীন ঐতিহ্য খেটে খাওয়া মানুষের মনের খোরাক জোগানো কাওয়াল গান ডাইনোসরের মত কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। কাওয়ালী গানও এখন শহরের গান হয়ে গেছে 
 সেইসাথে হাজার জাতের ধানের মাঝের দুলাল কবির কণ্ঠে দেহতত্ত্ব, আধ্যাত্মিকসহ চলচ্চিত্রের মনকাড়া হরেক রকমের গান দোতারার সুরের মূর্ছনায় গ্রামের মানুষের মনের খোড়াক জোগানো চটুল সুরের গান কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সেই সময়কার হাজারো ভক্ত শ্রোতার মন জয় কারী চটুল সুরের অধিকারী দুলাল কবিও আজ হারিয়ে গেছে লাখো শ্রোতার -ভক্তর মাঝ থেকে। স্রোতা আর ভক্তরাও যেন তার খোঁজ খবর নেয়ার অবকাশ রাখেনা। গেল ১৫ বছর আগেই যেন কাওয়ালী গানের আসর থেকে বিদায় নিয়ে, অভাব-অনটন আর রঙিন জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে এক দুর্বিসহ জীবনের মাঝে প্যারালাইসিস এ আক্রান্ত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
আজ রবিবার চিলাহাটি ওয়েব ডটকম  তার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়ি উঠোনে অনেকটাই নির্বাক আর শ্রবণ শক্তি হারিয়ে অপলক দৃষ্টিতে বসে আছেন। কথা বলার নেই কোন ভাষা, হারিয়েছে তার চোখের দৃষ্টিশক্তি সব কিছুর মাঝেই যেন সংবাদকর্মীদের দেখামাত্রই ইশারায় বসার তাগিদ দিয়ে আপ্যায়নের জন্য বিন্দু পরিমান নেই তার মাঝে কোন ঘাটতি। এক সময়ে দেশের বিভিন্ন গ্রাম মহল্লায় গান গেয়ে উপার্জিত টাকা দিয়ে সংসারের ঘানি টেনে এসেছেন। রঙ্গ রসে মঞ্চ কাঁপানো সেই দুলাল কবি আজ অনেকটাই দারিদ্র্যের কষাঘাতে পিষ্ট হয়ে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটছে।
একদিকে নিজের চিকিৎসা জন্য মিলছে না অর্থের যোগান, অন্যদিকে ঘরে জ্বলছে না ঠিকমতো চুলা। অসচ্ছল শিল্পীর সংকট মুহূর্তে কেউ সহায়তা করছেন না বলে জানিয়েছেন তার পরিবারবর্গ। শিল্পী ভাতার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুদান ও তার ভাগ্যে জোটেনি।