Home » » মায়ের মুখ [একজন রিপোর্টারের ডায়েরি ]

মায়ের মুখ [একজন রিপোর্টারের ডায়েরি ]

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 19 June, 2020 | 11:07:00 PM

মায়ের মুখ 
[একজন রিপোর্টারের ডায়েরি ] 

 ॥ আবদুল কাদির ॥ 
 আমি আমার মাকে কতটা ভালবাসি সে কথা বোঝানোর মত শব্দ বাক্য আমার জানা নেই। মাকে ভালবাসার ব্যপারটি আমাদের সংস্কৃতিতে সব সন্তানের বেলায় একই রকম। ব্যতিক্রম থাকতে পারে। সেটি উদাহরণযোগ্য নয়। তবে, গত শতকের নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকে আমাদের দেশে একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে, পারিবারিক বন্ধনে টান ধরেছে এমন কথা অনেকেই বলে থাকেন। মা ও সন্তানের হৃদ্যিক বিষয় নিয়ে আমার একটি ছোট গল্প আছে। গল্পটির নাম ’ফেরা’। ফেরা’র ইংরেজি শব্দ রিটার্ণ। গল্পটি ২০১৪ সালে একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। গল্পটির সারবস্তু এরকম. কিছুক্ষন আগে নাটোর রেলস্টেশন ত্যাগ করে রুপসা নামের আন্তঃনগর ট্রেনটি খুলনা অভিমুখে চলে গেছে। এসময় পাঁচ ছয় বছর বয়সি একটি মেয়ে হাত পা ছুঁড়ে আকাশ পাতাল একাকার করে কাঁদছিল। বলছিল, মা তুমি আমাকে ছাড়ি যাইওনা, আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা। পাশের একজন মহিলা শিশুটিকে সান্তনা দিচ্ছিল। তোর মা আবার ফিওে আসবে। যে মহিলা সান্তনা দিচ্ছিল শিশুটিকে সে হচ্ছে ওর নানী। মহিলার বাড়ি নাটোর রেলস্টেশনের লাগোয়া বস্তিতে। তার মেয়ে রমিছাকে বিয়ে দিয়েছিলেন একই বস্তির শাহাজাহান নামে এক তরুণের সাথে। রমিছা তখন ছিল ক্লাশ সেভেনের ছাত্রী। আর শাহাজাহান ট্রেনে ট্রেনে নাটোরের কাঁচাগোল্লা, তিলের খাজা, বাদাম. চানাচুর বিক্রি করতো। কখনো কখনো রাজমিস্ত্রির যোগানদার হিসেবে কাজ করতো। কাজ না থাকলে রিক্সা ভ্যান চালাতো। রমিছা আর শাহাজানের বিয়ে হয়েছিল পারিবারিক ইচ্ছায়, পছন্দে। রমিছার মা ভেবেছিলেন শাহাজাহান কর্মঠ, পরিশ্রমী ছেলে। তার ঘরে মেয়েটি অন্ততঃ না খেয়ে থাকবেনা।
বিয়ের এক বছর পরে তাদের এক ফুটফুটে মেয়ের জন্ম হয়। শাহাজাহান তার মেয়ের নাম রাখে জোছনা। জন্মের পর মেয়েটিকে ছেড়ে একটা দিনও সে বাইরে কাটায়নি । বাড়িতে এসেই খোঁজ নিত জোছনার। রমিছা শাহাজানকে বলতো জোছনা আমাদের লক্ষী মেয়ে। ওর জন্মের পর আমাদের সব রকম দুঃখ কষ্ট দূর হয়েছে। শাহাজান তার মেয়ের জন্য নিত্য নতুন জামা কাপড় নিয়ে আসতো। নানা ধরনের খাবার নিয়ে আসতো। মেলায় নিয়ে যেত মেয়ে জোছনা আর ওর মা রমিছাকে।
একসময় শাহাজাহান এলাকার নির্মান শ্রমিকদের সাথে ঢাকা চলে যায়। যাবার সময় সে রমিছাকে বলে, ঢাকায় কাজ করবো কন্ট্রাক্টরের আন্ডারে। হাজিরা পাবো দিন তিনশ’ টাকা। দৈনিক একশ’ টাকা খরচ হবে। বাকী সব টাকা পাঠায়ে দিব। ঢাকায় গিয়ে শাহাজাহান প্রথম প্রথম ভালই টাকা পাঠায়। প্রতি রাতে মোবাইলে কথা বলে রমিছা আর মেয়ে জোছনার সাথে। জোছনা প্রতিদিন বাবার কাছে জানতে চায় কবে সে বাড়িতে আসবে।
কিন্তু টাকা পাঠানো আর মোবাইলে কথা বলার মধ্যে একসময় ভাঁটা পড়ে। রমিছার কাছে ব্যপারটি কেমন যেন গোলমেলে মনে হয়। মনে মনে ভাবে, উদ্বিগ্ন হয় শাহাজাহানকে নিয়ে। একদিন বস্তির রশিদ ঢাকা থেকে আসে। তার কাছে বিশদ জানতে পারে রমিছা। বড়ভাই আনিছুরকে নিয়ে রমিছা ঢ়াকা চলে যায়। সঙ্গে জোছনাকেও নিয়ে যায়। ঢাকার কুড়িল বিশ্বরোডের বস্তিতে গিয়ে হাজির হয় । দেখা হয় শাহাজাহান আর সদ্য বিয়ে করা স্ত্রী রঙ্গিলার সাথে। জানতে পারে রঙ্গিলা তার স্বামী মুন্নাকে ডিভোর্স দিয়ে শাহাজাহানকে বিয়ে করেছে। রমিছা ঘটনার আকস্মিকতায় পাথর বনে যায়। শুধু বলে এখন তোমার মেয়ে জোছনার কি হবে। ঢাকা থেকে নাটোরে ফিরে এসে রমিছা স্বামী শাহাজাহানকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেয়। এর পনের দিনের মধ্যে সে কুষ্টিয়ার এক যুবককে বিয়ে করে।
ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার পরে স্টেশনে অপেক্ষমান যাত্রীরা জোছনার কান্নাকাটিতে একরকম বিহবল হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে শোনা যায় খুলনা অভিমুখে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর রুপসা ট্রেন থেকে কে একজন নারী লাফ দিয়ে আতœহত্যা করেছে। সদ্য বিয়ে করা এই নারী যাচ্ছিল তার স্বামীর বাড়ি।// আমার মায়ের বয়স এখন পচাত্তুর। হিসেবটা এ্যাকুরেটনা। এক দুই বছর বেশি হতে পারে। আবার কমও হতে পারে। মায়ের বিয়ে হয়েছিল বারো বছর বয়সে। সে সময় আমার বাবা ছিলেন চৌদ্দ বছরের এক কিশোর। থাকতেন তার বোনের কাছে। বোন তাঁকে কোলে পিঠে ¯েœহ আদরে বড় করেছিলেন। বাবার জন্মের চৌদ্দদিনের মাথায় আঁতুড় ঘরে তার মা মারা যান।
বিয়ের দুই বছর পরে মায়ের প্রথম মেয়ে সন্তান জন্ম হয়। দেড়বছর পরে জন্ম আমার । আমরা ছিলাম পাঁচবোন, দুই ভাই। সবার বড় আর সবচেয়ে ছোট এই দুইবোন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমার জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার( আগে ছিল মহকুমা) চিলমারী থানার অষ্টমীরচর ইউনিয়নের ছালিপাড়া গ্রামে। এই গ্রামটি ছিল চিলমারী নদীবন্দর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ব্রক্ষপুত্রের মাঝখানে। অনেক বছর আগে এই গ্রাম, চরটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বাড়ি ভেঙ্গে যাওয়ার দু’দিন আগে ভরা বর্ষায় আমার বাবা ঘরদোর নৌকায় ভরে উত্তর কোদালকাটিতে নিয়ে যান। উত্তর কোদালকাটি এখন রাজিবপুর উপজেলার মধ্যে পড়ে। আগে এই উপজেলা ছিল একটি ইউনিয়ন মাত্র। সে ইউনিয়ন ছিল রৌমারী থানার অন্তর্গত। উত্তর কোদালকাটি গ্রামে আমার খুব বেশি যাওয়া হয়নি। তবে, আমার মা আর বাবা তাদের ছেলের কাছে বহুবার এসেছেন। থেকেছেন একেকবার মাসাধিককালের বেশি।// আমি থাকি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলা সদরে। পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নেশায় একজন সংবাদকর্মী। জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকার এখানকার একক এজেন্ট। দেশব্যাপি সুপ্রতিষ্ঠিত একটি কুরিয়ার সার্ভিসেরও উপজেলা এজেন্ট। পাঠ্যপুস্তক ও সৃজনশীল বইয়ের ব্যবসা এবং মাছচাষের সাথে জড়িত আছি ৩৭ বছর ধরে। আমার অনেক বন্ধু, পরিচিত ও ঘনিষ্টজনরা জানতে চান এতসব সামাল দিই কিভাবে। আমি আপনাদের সময় নষ্ট করছি মনে হয়। করোনার কারনে সবাইতো ঘরে বসে আছেন। কাজের তাড়াও এসময় কম। সময়টা ভাল কাটবে বই পড়ে, গল্প প্রবন্ধ ও নিবন্ধ পড়ে।
আমি ফিরে যেতে চাই আমার শৈশবে। ছালিপাড়া চরে এই প্রথম একটি প্রাথমিকের স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ওই স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালে আমাকে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। এখান থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পাশ করার পর ব্রক্ষপুত্র নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায় আমাদের স্কুলটি। বিদ্যালয় না থাকায় পুরো একটি বছর আমাকে বসে থাকতে হয়েছে। যেমনটি করোনার কারণে স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকায় সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাড়িতে বসে আছেন। প্রেক্ষাপটটি ভিন্ন। করোনার কারনে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হলেও এ অবস্থার একসময় অবসানতো হবেই। ফিরে আসবে স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু বিদ্যালয় ভেঙ্গে যাওয়ায় আমাদের লেখাপড়া একেবারে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়ে। তবে আমি স্কুলে যেতে না পারলেও আমার লেখাপড়া একদিনের জন্য বন্ধ থাকেনি। সকাল বিকাল দুইবেলা বাড়িতে বই নিয়ে পড়তে বসেছি। আমার এক কাকা ছিল আমার সহপাঠী। আরেক কাকা গৃহশিক্ষক। তবে তাকে টাকা পয়সা দিতে হতোনা। আমার এই কাকা বাবার আপন কাকাতো ভাই। তার নাম ছিল আইজল হোসেন। তিনি রৌমারী থানার পাখিউড়া ফ্রী প্রইমারী স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেছিলেন। কাকাদের বাড়ি নদীতে ভেঙ্গে যাওয়ায় তার আর পড়ালেখা হয়নি। আমার এই কাকার হাতের লেখা ছিল অত্যান্ত চমৎকার। আমি সকাল বিকাল বাড়িতে পড়তে বসলেও রাতে কোনদিন পড়তে পারিনি। সন্ধ্যার আগে মা আমাদের সব ভাইবোনদের ডেকে খেতে দিতেন। রাতে আমাদের বাড়িতে কুপি হারিকেন জ্বলতোনা। তবে আমার বাবা চিলমারী আর কর্তিমারী হাট থেকে রাতে বাড়িতে এলে মা কুপি জ্বেলে তাকে খেতে দিতেন দেখেছি।
আমার বড় বোনের বিয়ে হয়েছিল দশবছর বয়সে। সে আমার সাথে স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়তো। দেখতে বোনটি ছিল খুব সুশ্রী-সুন্দরী। গায়ের রঙ ছিল ফর্সা আর বেশ লম্বা। আমার নানা নানি ওর বিয়ে ঠিক করেছিলেন। নানি বলতেন, মেয়েদের বেশি পড়িয়ে লাভ নাই। তার চাইতে ভাল ছেলে যখন পাওয়া গেছে হাতছাড়া না করাই ভাল হবে। বিয়ের সময় আমার বোনের স্বামীর বয়স ছিল চৌদ্দ বছর । ওর নাম ছিল মোঃ জালাল মিয়া। মিয়া পরিবারের ছেলে। বিয়ের পর ওদের সংসারে এক এক করে সাতটি ছেলের জন্ম হয়। এর মধ্যে ছয় ছেলে বেঁচে আছেন। তারা সবাই বিয়েথা করে সংসার করছে। সবারই পৃথক সংসার। আমার এই বোনটি সব ছোট ভাই বোনদের স্নেহ করতেন। কখনো কারও ওপর রাগ করতে দেখিনি। বয়স অল্প হলেও মা বাবা কষ্ট পান এমন কথা নিজে কখনো বলতেননা , কাউকে বলতেও দিতেননা। বাবা হাট থেকে জিলিপি, রস গোল্লা অথবা অন্যকোন খাবার নিয়ে এলে মা সবাইকে বড় বোনের কাছে পাঠিয়ে দিতেন। বোন সব ভাইবোনদের মাঝে খাবার সমান ভাগে ভাগ করে দিতেন। মা বাবার জন্য পৃথক দু’টি ভাগ করতেন।
একবার রোযার ঈদে বাবা আমাদের সব ভাইবোনদের জন্য জামা কাপড় কিনে আনেন। আমার হাফ হাতা শার্ট আর হাফ প্যান্টের রং ছিল একেবারে কাঁচা। একবার ধোয়া পরলে সব সাদা হয়ে যাবে।বোনকে বলি,দেখতো বাবা কি এনেছেন আমার জন্য ? বোন আমার মুখে হাত চেপে ধরে বলেন, এমন কথা কখনো বলবিনা, কাউকেনা। বাবা শুনতে পেলে খুব কষ্ট পাবেন। ঈদের দিন এই জামা কাপড় পরে ঈদ করবি। পরে না হয় আর পরবিনা।
আমার এই প্রিয় বোন মারা গেছেন পাঁচবছর হলো। দুই বছর পরে ওর স্বামী মারা গেছেন। আর বোনের দুই বছর আগে আমার বাবা মারা গেছেন। আমার বাবা জীবনে কোনদিন স্কুলের বারান্দা পর্যন্ত যাননি।। সারা জীবন তিনি কষ্ট করেছেন। কিন্তু একটা দিনও কোন কারণে ছেলে মেয়েদের ওপর রাগ হননি। খুব বেশি রেগে গেলে বলতেন, কবে মানুষ হবে তোমরা।
আমরা যে স্কুলে পড়তে শুরু করেছিলাম তার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গ্রামের চার রত্ন। তারা ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে চলে আসেন। পরীক্ষার ফল বেরনোর আগে তিন মাস পর্যন্ত বাড়িতে থাকেন।এসময় বড় ধরনের একটি খড়ের ঘর তৈরি করে তার নাম দিলেন ছালিপাড়া ফ্রী প্রাইমরী স্কুল। গ্রামের সব ছেলেমেয়েদের এই স্কুলে নিয়ে আসেন। তিন মাস পরে যখন রেজাল্ট বের হলো দেখা গেল তিনজন পাশ করেেেছন । আর একজন ফেল করেছেন। পাশ করা তিনজনের নাম নূর মোহাম্মদ, আনোয়ার আলী ও আবাদুল বারেক। ফেল করেছেন নূর ইসলাম । তিনজনের মধ্যে একজন হলেন আমার মামা। একজন কাকা আর একজন ফুপাতো ভাই। পাশ করার পরে তিনজন কুড়িগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। নূর ইসলাম ওই স্কুলে থেকে যান। পরের বছর তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন। দেশ স্বাধীন হলে তিনি স্কুলটির প্রধান শিক্ষক হন। পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাদেশের সব প্রাথমিক স্কুলকে সরকারিকরণ করলে এটিও তার মধ্যে পড়ে।
আমাদের স্কুলটি নদীতে ভেঙ্গে গেলে আমি আমার মামা, কাকা আর ফুপাতো ভাইকে ধরে বসি। বলি, আমার লেখা পড়ার কি হবে এখন। আমার কথায় তিনজনই ব্যথিত হন। তাদের মুখের ভাষা হারিয়ে যায়। এসময় আমার মামা নূর মোহাম্মদ বলেন, তোমাকে কোথায় নিয়ে রাখবো আর কোন স্কুল ভর্তি করাবো এ চিন্তায় আমরা তিনজনই অস্থির হয়ে আছি। তিনজনই আমাকে সান্তনা দেন। আশ্বস্ত করে বলেন,এবার কুড়িগ্রাম গেলে তোমার থাকার জায়গা খুঁজে বের করবোই। আর তুমিও সেখান থেকে পড়ালেখার সুযোগ পাবে নিশ্চয়। এরপর কলেজ বন্ধ হলে ওনারা তিনজন একসঙ্গে কুড়িগ্রাম থেকে বাড়িতে আসেন। তিনজনই জানালেন, আমরা তোমার থাকার ও পড়ার ব্যবস্থ করে এসেছি। সেদিন আমি ওনাদের সামনে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম। কলেজ খুললে আমাকে সাথে করে নিয়ে যান তারা। কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনের উত্তর দিকে আউটার সিগন্যালের বামদিকের গ্রামটির নাম বেলগাছা।এই গ্রামের ছোট্র একটি পরিবারে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়। গ্রামের নামে প্রতিষ্ঠিত বেলগাছা ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে ক্লাশ ফোরে আমাকে ভর্তি করা হয়।
ওই স্কুলে আমি মাত্র একবছর পড়েছি। ক্লাশ ফাইভে ওঠার পরে অল্প কিছু দিনের মধ্যে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয় উলিপুর থানার তবকপুর ইউনিয়নের উমানন্দ নামের একটি গ্রামে। ভর্তি করা হয় উমানন্দ ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আহাম্মদ আলী স্যার। ক্লাশ ফাইভে সহপাঠী ছিলেন মোট আটত্রিশ জন । সবার নাম এখন আর মনে করতে পারিনা। তবে মেধাবী ছাত্র ছিলেন আব্দুল হালিম দুলাল। ওর বাবা আবদুল খালেক ছিলেন বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক। আমাদের তিনি ছিলেন অংকের শিক্ষক। সহপাঠীদের একজন ছিলেন বদিউল আলম। উমানন্দ জুনিয়র হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শহর পন্ডিত ছিলেন তার বাবা। মরহুম শহর পন্ডিতের ছিল ছয় পুত্র আর দুই কণ্যা। তার বড় ছেলের নাম মোঃ আবু বকর সিদ্দিক এমএ বিএড ফার্স্ট ক্লাশ ফার্স্ট। তিনি রাজশাহী শিরইল গভঃ বয়েজ হাইস্কুলের ও কলেজিয়েট স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। স্বাধীনতার পরে তিনি ছিলেন রংপুর মডার্ণ হাইস্কুলের ( পরে রংপুর ক্যাডেট কলেজ) শিক্ষক। আবু বকর সিদ্দিক সাহেবের ছোট পাঁচ ভাই ও দুইবোনদের নাম মোঃ নুরুজ্জামান, মোঃ খলিলুর রহমান বিএসসি, মোঃ রোস্তম আলী এমএসসি, বদিউল আলম,খালেকুজ্জামান এমকম ,মোছাঃ বেগম ও মোছাঃ গোলাপী। ভাইবোনেরা সবাই ছিলেন শিক্ষিত,এরমধ্যে তিন ভাই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত।
আমার অন্য সহপাঠীদের মধ্যে আব্দুল আউয়াল,আবুল কাশেম, আবুল হোসেন এদের নামও স্মরণে আছে। মেয়েদের মধ্যে লুৎফুন্নেসা মীনা আর সুফিয়ার কথা বলতে পারি। তবে, মীনার নামটি আমি একদিনের জন্য ভুলতে পারিনি। আমাদের বন্ধুত্বের বিষয়টি দুই পরিবরের সবারই জানা।
উমানন্দ ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে পড়বার সময় মাত্র এক বছরের মধ্যে অন্তত তিনটি বাড়িতে আমাকে থাকতে হয়েছে। বছরটি কেটেছে আমার চরম অনিশ্চয়তা আর উৎকন্ঠার মধ্যে। সেসময় ওই অঞ্চলে চরম অভাব ছিল। কোন কোন দিন না খেয়েই আমাকে স্কুলে যেতে হতো। সেবার বার্ষিক পরীক্ষায় আমি সেকেন্ড হই।

 ।দুই। 


এর আগে বেলগাছা ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে ক্লাশ ফোরে বার্ষিক পরীক্ষায় আমি ফার্ষ্ট হই। আমার ফার্ষ্ট হওয়ার পেছনে যার সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল সে হলো আমাকে যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন সেই গৃহিনী। ওই গৃহিনী আর তার স্বামী একদিন আমাকে বলেছিলেন, শোন ছেলে, তুমি পড়া লেখায় ভাল করলে এখানকার সব মানুষ বলবে এই ভাল ছেলেটি ওই বাড়ির। তখন আমাদের মনটা গর্বে ভরে উঠবে। রেজাল্ট হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে আমার ছোট মামা নূরমোহাম্মদ একদিন এলেন। বলেন, বাবা শোন, আমারতো রাজশাহীতে চাকুরি হয়েছে। আমি চলে গেলে তোমার বাড়ি যাওয়া খুব কষ্ট হবে। তাই তোমাকে চিলমারী , বালাবাড়ি অথবা এর আশেপাশে কোথাও কোন এক বাড়িতে রেখে দিব। আর ভর্র্তি করে দিব উমানন্দ ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে। মামার কথা শুনে আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি কিছুই বলতে পারছিলামনা। আমি বুঝতে পারি এখান থেকে চলে গেলে অভিভাবকহীন হওয়ার আশংকা আছে। আমার ছিল দুই মামা। বড় মামা কাশেম আলী জমিজমা,আবাদ বসত দেখাশোনা করতেন। বাড়ি থেকে তিনি ছোট মামার লেখাপড়ার জন্য খরচ দিতেন। সেইসাথে আমার যখন যা লাগতো তাও তিনি দিতেন। আমার দুই মামা আমার কাছ থেকে কষ্ট পান এমন কোন কথাই সেদিন বলেতে পারিনি । আশ্রয়দাতা গৃহিনীকে যখন চলে যাওয়ার কথা বলি, মনে হচ্ছিল এরকম কথা তার কাছে প্রত্যাশিত ছিলনা। মাথায় বাজ পড়ার মত অবস্থা হয়েছিল তার। বাড়ির এই গৃহিনীকে আমি বুবু বলে ডাকতাম। প্রতিদিন ভোরে সে আমাকে ডেকে ওঠাতেন। বলতেন , মুখ ধুয়ে এসে পড়তে বস্ । তার কোলের তিন বছর বয়সি বাচ্চাটি আমার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলতেন, খেয়াল রাখবি । কান্নাকাটি করলে ডাক দিবি। এরপর বাড়ির গরু বাছুর, ছাগল, হাস মুরগি ঘর থেকে বের করে আনতেন । বুবুর স্বামী সবগুলোর খাবার দিতেন। স্বামী স্ত্রী মিলে সব কাজ ভাগ করে করতেন। বেলা ওঠার পরে বেতের তৈরি ঝুঁড়িতে করে মুড়ি দিয়ে যেতেন। বলতেন, খেয়ে নিবি। গ্লাসে পানি থাকলো। সকাল আটটার দিকে এসে বলতেন, যা কূয়া থেকে পানি পানি তুলে রেখেছি মাটির চাড়িতে। ওই পানি দিয়ে গাও ধুয়ে আয়। কুয়ার পানি তুলতে যাসনে কিন্তু। পড়ে গেলে মরে যাবি। গোসল সেরে এলে গরম ভাত খেতে দিতেন। ভাতের সাথে থাকতো আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা, কলা ভর্তা অথবা এ জাতীয় কিছু। ভাত দিতেন ঠিক এক বাটি। স্কুল থেকে ফিরে এলে বলতেন,বদনায় পানি রাখা আছে। হাত মুখ ধুয়ে আয় ভাল করে। খাবারে থাকতো শাক-সব্জি, ডাল আর ছোট মাছ। আমি কোনদিন একবারের বেশি ভাত নিতামনা। বুবু বেশি বেশি করে তরকারি তুলে দিতেন। বলতেন, ভাতে বেশি ভিটামিন থাকেনা। তাই বেশি বেশি করে শাক-সব্জি খাবি। খাওয়া শেষ হলে বলতেন, এখন শুয়ে পড়বিনা কিন্তু। বই নিয়ে বারান্দায় পড়তে বসবি। প্রথমে অংক, তারপর ইংরেজি। এভাবে বাংলা, সমাজ, বিজ্ঞান আর সবশেষে ধর্ম পড়া শেষ করবি। সব পড়া শেষ করবি এ বেলায়। রাতে আর ভোরে শুধু রিভাইজ দিবি। স্কুলে যেয়ে সামনের বেঞ্চে বসবি প্রতিদিন, দেখবি সব স্যার তোকে স্নেহ করে।
একদিন বিকেল বেলা সপ নিয়ে পড়তে বসেছি। বুবু তার কেলের বাচ্চা নিয়ে আরেকটি সপ বিছিয়ে বসে পড়লেন। বলেন, এই অংকটা আরেকবার করতো দেখি। দ্বিতীয়বার অংকটি করতে গিয়ে দেখি আগেরবার ভুল করে ফেলেছি। জানতে চাই বুবু তুমি কোন ক্লাশ পর্যন্ত পড়েছো? জবাবে বলেন, ক্লাশ টেন পর্যন্ত পড়েছিলাম। পরীক্ষার আগে মা বাবা বিয়ে দিয়ে দিলেন। আমার বাবা খুব গরীব মানুষ, পড়ার খরচ চালাতে পারছিলেননা তাই বিয়েতে আমি আপত্তি করিনি। বুবুকে একদিন বলি, তুমিতো আবার পড়তে পারো। হেড স্যারকে বলে আবার পরীক্ষা দিতে পারো। বুবু কোন কথাই বলতে পারলেননা । সেদিন রাতে বুবু তার স্বামীকে আমার বলা সব কথা খুলে বললেন। পাশের ঘর থেকে আমি সব শুনতে পেলাম। বুবুর স্বামী বললেন, ওতো ভালো কথাই বলেছে। তুমি চাইলে আবার স্কুলে যেতে পারো। আমিতো আগাবেলা বাড়িতেই থাকি। বাবুকে দেখে রাখতে পারবো। 
পরদিন বুবু কুড়িগ্রাম গার্লস হাইস্কুলে গিয়ে হেড স্যারের সাথে দেখা করে নতুন করে পড়তে শুরু করেন। এর ছয় সাতদিন পর মামা এসে আমাকে নিয়ে যান। তিনি আমাকে ভর্তি করেন উলিপুর থানার তবকপুর ইউনিয়নের উমানন্দ ফ্রী প্রাইমারী স্কুলে। বেলগাছা থেকে বিদায় নেবার দিন বুবুকে বলি, তুমি কিন্তু লেখাপড়া বাদ দিয়োনা আর। সে আমার মাথায় হাত রেখে কথা বলছিল। বলেন, আমি লেখাপড়া আর কিছুতেই বাদ দিবনা। কিন্তু লেখাপড়া করে কি করবো তাতো বললিনে। বুবুর স্বামী তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি কোনরকম ভাবনা চিন্তা না করেই তাঁকে বলে ফেলি , কেন স্কুলে মাষ্টারি করবে। আমার পৃথিবীটা ছিল খুব ছোট। জানা বোঝা আর ভাবনার পরিসর খুব বড় ছিলনা। বুবু আমার কথা শুনে তার মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলেন। তার চোখের পানি আমার মাথায় পড়লো কয়েক ফোঁটা। তিনি ছোট্ট করে বলেন, তাই হবে। বুবু আর তার স্বামীকে কদমবুচি করে বিদায় নিলাম। কদমবুচি শেষে বুবু আদর করে কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমু দিলেন। বললেন, এমনভাবে বললি যেন আগের জন্মে তুই আমার মায়ের পেটের ভাই ছিলি। এইযে, আরেক জন্মের কথা শুনলাম সেটিও তার মুখে প্রথম শোনা। তার সে কথা আমি জীবনভর বিশ্বাস করে এসেছি।
আমার এসএসসি আর এইচএসসি রাজশাহীতে। শিরোইল গভর্নমেন্ট বয়েজ হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাশ করি ১৯৭৪ সালে। এরপর ভর্তি হই রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে। আমার এসএসসি’র রেজাল্ট বের হওয়ার পরদিন ট্রেনযোগে আমি রাজশাহী থেকে পার্বতীপুর, রংপুর, কুড়িগ্রাম চিলমারী হয়ে বাড়ি যাই। আমার ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল রাজশাহী থেকে চিলমারী পর্যন্ত। কিন্তু আমি নেমে পড়ি কুড়িগ্রাম রেলস্টেশনে। ট্রেনটি চিলমারী অভিমুখে চলে যাওয়ার পরে আমি বেলগাছার দিকে হাটা শুরু করি। এখান থেকে চলে যাওয়ার পর আর আসা হয়নি কখনো। মনে মনে ভাবছিলাম বুবু আর তার স্বামী আমাকে মনে রাখেননি। তারা চিনতেও পারবেনা হয়তো। আমার ভুল ভাঙ্গে বুবুর কথায়। বলেন, এতদিন পর তোর বুবুর কথা মনে পড়লো? জানলাম বুবু এসএসসি, এইচএসসি পাশ করে বেলগাছা সরকারী প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েছেন। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত বুবু আর আমার মধ্যে কথা হলো। বুবুর স্বামী অনেক সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি চলে যান। যাওয়ার সময় বলেন, বুঝছি আজ রাত শেষ হবে কিন্তু তোমাদের কথা শেষ হবেনা। সকালে চলে আসার সময় বুবু বলেন, চিঠি দিবি প্রতি সপ্তাহে।

 ।তিন। 

 আমার মা হাটতে গিয়ে পড়ে যান। পায়ে আঘাত পাওয়ায় দাঁড়াতে পারেননা, সংবাদটি আমি পেলাম চব্বিশে মার্চ । বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম ছাব্বিশে মার্চ। মাকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতাল অথবা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা করাবো। কিন্তু করোনার কারনে সারা দেশে সরকার সাধারন ছুটি ঘোষনা করলেন। ছাব্বিশে মার্চ থেকে ট্রেন বাস লঞ্চ সব কিছু বন্ধ হয়ে যায়। এরফলে আমার বাড়ি যাওয়া বিলম্ব হলো। মায়ের চিকিৎসা করাতে দেরী হওয়ায় তার কষ্টটা দীর্ঘায়িত হলো। অবশেষে গত ষোল এপ্রিল দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে চিলমারীর উদ্দেশ্যে সকাল সাতটায় রওয়ানা দিলাম। পার্বতীপুর থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারীর দূরত্ব নব্বই কিলোমিটারের বেশি। ট্রেনে বাসে গেলে পাঁচ ঘন্টার বেশি লাগার কথা নয়। চিলমারী থেকে নদীপথে যেতে লাগে প্রায় দেড় ঘন্টা। এটা হলো ট্রলারে যাওয়ার হিসেব। বাস ট্রেন না থাকায় রিক্সা ভ্যান অটোযোগে ভেঙ্গে ভেঙ্গে চিলমারীর রমনা বাজারে ব্রম্মপুত্র ঘাট পর্যন্ত পৌছুতে সন্ধ্যে হয়ে যায়। সময় লাগে পুরো এগারো ঘন্টা। 
 ঘাটে পৌছে ইজারাদারের কাছে জানতে পারলাম গত সাতদিন ধরে কোন নৌকা পারাপার করতে পারেনি। পুলিশ প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছে। আর উপজেলা প্রশাসন চিলমারীর হাট বন্ধ করে দিয়েছে সাতদিন হলো। নদী পার হওয়ার মত কোন ব্যবস্থা না থাকায় রাতটা এক নিকটাতœীয়ের বাড়িতে কাটালাম। বাড়িটি উলিপুর থানা সদরে, পৌরসভার জোতদার পাড়ায়। বাড়ির নাম হক ভিলা। নিকটাতœীয় বলতে আমার রক্ত সম্পর্কিত কেই নন। তবে, তার চেয়েও বেশি, পরমাতœীয় যাকে বলে। এই বাড়ির কারো কোন অসুখ বিসুখ হলে , সমস্যায় পড়লে আমি নিজের অসুখ, সমস্যা বলে মনে করি। তারাও আমার অসুখ, বিপদে -আপদে পাশে এসে দাঁড়ান। পরদিন সকাল বেলা গরম ভাত খেয়ে এখান থেকে বের হলাম। আমার মাকে নিয়ে দুই ভাগ্নে আর ছোটবোন সূর্যবানু নৌকা যোগে নদী পার হয়ে এপারে চলে আসায় আমাকে আর ওপারে যেতে হলোনা। সকাল দশটার দিকে মাকে নিয়ে এ্যামবুলেন্সে কুড়িগ্রাম যাই।ডাক্তারের পরামর্শে সব টেস্ট করা হলো। রিপোর্ট পেলাম বেলা দু’টার দিকে। জানলাম প্রেসারে স্ট্রোক করেছিলেন তিনি। প্রেসকিপশন হাতে নিয়ে একমাসের সব ঔষুধ নিলাম। এরপর আবার এ্যাম্বুলেন্সে করে চিলমারী পাঠিয়ে দিলাম সবাইকে। মায়ের কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় মা হাত বাড়িয়ে দিলেন। মাথাটা কাছে টেনে কপালে চুমু দিলেন। যেমনটি তিনি আমার ছোটবেলায় করেছেন। বুঝতে পারি মায়ের কাছে ছেলের কোন বয়স নাই। ছেলে সারা জীবন মায়ের কাছে শিশুই থেকে যায়।
মাযের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একটি অটো ভাড়া করে রাজার হাট চলে আসি। রাজার হাট বাজার পার হলাম পায়ে হেটে। বাজার পেরিয়ে একটা চার্জার রিক্সা নিলাম। কাউনিয়া বাজার স্ট্যান্ড এসে পৌছুলাম রাত সাড়ে আটটার দিকে। স্ট্যান্ডে পরিচয় হয় কাউনিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের সাথে। তিনি একটি কোম্পানির ট্রাকে উঠিয়ে দিলেন আমাকে। রংপুর টার্মিনালের কাছাকাছি আসার পর ট্রাক থেকে নেমে পড়ি। এরপর ভেঙ্গে ভেঙ্গে নানান বাহনে পার্বতীপুরে বাড়িতে এসে পৌছি রাত দেড়টার দিকে।
করোনার ভয়াবহতা উপলব্ধি করে দেশের মানুষ এখন ঘরে অবস্থান করছে। রাস্তায় কোন গণপরিবহন চলছেনা। মাকে বিদায় দিয়ে পার্বতীপুরে ফিরে যাবার পথটি ছিল সীমাহীন কষ্টের, মনে রাখার মত। কিন্তু সব কষ্ট আমার কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছে একারণে যে, আমি মায়ের কাছে যেতে পেরেছি। সব টেস্ট করার পর তার চিকিৎসা শুরু করা গেছে। ডাক্তার বলেছেন, আপনার মা ভাল হয়ে উঠবেন। স্ট্রোক করার পরপর ওনার চিকিৎসা করাতে পারলে এতদিনে আবারও হাটতে পারতেন।
আমার মাকে আমি কখনো ভুলতে পরিনা, একমূহুর্তের জন্যও না। সেই শিশুকালে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম, আমাকে বিদায় দিতে মা, বড়বোনের সাথে ছোট ভাইবোনেরা নদীর ঘাট পর্যন্ত এসেছিল। বাড়ি থেকে নদীর ঘাটের দূরত্ব ছিল প্রায় দুই মাইল। নোৗকায় ওঠার আগে মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলেন, আমার বাজান, মায়ের মুখটা ভাল করে দেখে যাও। আমি জানতাম আমার মা সবসময় কম কথা বলতেন। সেই মাকে আমি অন্য চেহারায়, অন্যরুপে দেখতে পেলাম।
ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার পর অনেক দূর চলে এসেছি। তখনও দেখতে পাই আমার মা দাঁড়িয়ে আছেন। নৌকায় ওঠার আগে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছি তার দুই গাল বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ার ঘন্টা দুয়েক পরে আমাদের বাদামতোলা নৌকাটি চিলমারীর শাখাহাতি পেরিয়ে ঘাটে এসে ভেড়ে। এরপর একেএকে সব যাত্রী নেমে পড়েন। আমার বড় মামা কাশেম আলী, ছোট মামা নূরমোহাম্মদ, ছোট কাকা আনোয়ার আলী ও ফুপাতো ভাই আবদুল বারেক তারাও নৌকা থেকে নেমে গেছেন। এসময় বাবার ডাকে সম্বিত ফিরে পাই। বাবা বলেন, বাজান সবাই নেমে গেছে । আর দেরী কোরোনা। বাবা আমাকে কোলে করে নৌকা থেকে নেমে ঘাটের ওপরে উঠে এলেন। আমি তখনও নদীর ওপারে তাকিয়ে দেখছিলাম। জানি মাকে আর দেখা যাবেনা। কিন্তু মনের চোখে তাঁকে ঠিকই দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমার মায়ের মুখ আমি স্কুলে কলেজে পড়ার সময় দেখেছি। এখনও দেখি। এবারও দেখেছি। আমার মা সুস্থ হয়ে উঠবেন, আবার জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দেবেন। বলবেন, আমার বাজান,আমার নাড়ীছেঁড়া ধন, আমার আত্মা। আমি মায়ের সুস্থতার জন্য ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে প্রার্থনা কামনা করছি। আমার মাকে আমি বারবার দেখতে চাই। মা তার দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে বলবেন, আমার বাজান। মায়ের মুখের বাজান ডাক, সম্বোধন আমি আরও অনেক দিন শুনতে চাই। বাজান এই ডাক পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্বোধন আমার কাছে। -

লেখক:- আবদুল কাদির, সংবাদ কর্মী,পার্বতীপুর,দিনাজপুর।