Home » , » নানা প্রতিকূলতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ঠাটারী কারিগরদের পেশা

নানা প্রতিকূলতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে ঠাটারী কারিগরদের পেশা

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 23 May, 2020 | 5:00:00 PM

মিজানুর রহমান,কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি,চিলাহাটি ওয়েব : সময় আসে, সময় চলে যায়। এই সময়ের মাঝে হারিয়ে যায় অনেক কিছুই। সেই পথ পরিক্রমায় হারিয়ে যাওয়া থেকে বাদ পড়েনি ঠাটারী কারিগরদের পেশা। আধুনিকতার ছোঁয়া আর আরাম প্রিয় মানুষদের ভিড়ে আজ ঠাটারী কারিগরদের পেশা হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। নানা প্রতিকূলতা আর প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে একসময়ের গৃহস্থালী পরিবারের নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য মেরামতের সাথে জড়িত নিপুণ কারিগর ঠাটারী পেশা।
দেশীয় এ শিল্পটিও সময়ের সাথে সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশীয় শিল্পটি আধুনিকতার যুগে মানুষের রুচির পরিবর্তনের সাথে পাল্লা দিতে না পেরে অলস সময় ও বেকার হয়ে পড়েছে এ শিল্পের সাথে জড়িত লোকজন। একসময়ের জনপ্রিয় কামার শিল্পের ( ব্যবসার)আদলে পড়া, ঠাটারী শিল্পটিও আজ কালের গর্ভে বিলীন হতে চলছে। এক সময় গৃহস্থ বাড়ির রান্না থেকে শুরু করে রাত্রিকালীন অন্ধকার দূরীভূত করার জন্য ব্যবহার হতো হারিকেন , ল্যাম্প (কুপি), হ্যাচাক লাইট, কৃষি কাজে কৃষকরা ব্যবহার করত তামার তৈরি স্প্রে মেশিন। সেই তামার তৈরি স্প্রে মেশিনের স্থানে জায়গা করে নিয়েছে প্লাস্টিকের তৈরি স্প্রে মেশিন। সিলভরের ব্যবহৃত পণ্য সামগ্রীর মধ্য ছিল হাড়ি, পাতিল, জগ, প্লেটসহ কত কি। গৃহস্থ পরিবারের মানুষ অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল দেশীয় শিল্প ঠাটারী পণ্য সামগ্রী ওপর। সিলভর, তামার তৈরি যাবতীয় পণ্য দু,চার বছর ব্যবহারের পর কোন ধরনের ভাঙ্গা, ফুটো হলে তখন এ পেশার কারিগরদের হাতে মেরামত করে আবারো চালাত দু,এক বছর।
তখন এ পেশায় কারিগরদের কদরও ছিল অনেক বেশি। আর কারিগররাও বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় ঘুরে গৃহস্থবাড়ির হাড়ি, পাতিল, জগ, হারিকেন, ল্যাম্প (কুপি), হ্যাচাক বাতি, তামার তৈরি স্প্রে মেশিনসহ হরেক রকমের পুরনো সামগ্রী মেরামত করে ফিরে পেত নতুনত্বের রুপ। এতে একদিকে সাশ্রয় হত পরিবারের দুই পয়সা। অন্যদিকে কারিগররাও সংসার চালাতে সচ্ছলভাবে। এখন যেন দুটির ভিন্ন চিত্র।
বর্তমান ডিজিটাল যুগের মানুষদের রুচিবোধের সাথে আয় -রোজকার বেড়ে যাওয়ায় পুরনো জিনিস পত্র ব্যবহারের বালাই না রেখে দিনদিন নিত্য নতুন প্লাস্টিক পণ্যে আর নামি দামি কোম্পানির বাহারী ডিজাইনের রান্না -বান্নার পণ্য সামগ্রী দিকে ঝুঁকে পড়েছে। এতে একদিকে বেকার হয়ে পড়েছ দেশীয় ঠাটারী শিল্প ও ঠাটারী কারিগর পেশায় জড়িত মানুষ। বর্তমানকালে আরামপ্রিয় মানুষজন অনেকটাই জ্বালানির বিকল্প হিসেবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন বৈদ্যুতিক জ্বালানির উপর। গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে গ্যাসের চুল, রাইস কুকার, কারি কুকার, ম্যাজিক চুলা, প্রেসার কুকার সহ বাহারী রংবেরঙের পণ্য-সামগ্রী। রাত্রিকালীন সময় ঘরে বাইরে জালানো হচ্ছে আলোকসজ্জা সজ্জিত বৈদ্যুতিক বাতি। সরেজমিনে দেখা যায়, মাগুড়া মন্ডল পাড়ায় গৃহস্থ বাড়ির উঠানে যত সামান্য মাটিতে গর্ত খুড়ে কাঠ কয়লা জালিয়ে ভাতির হাওয়ায় (কাগজের তৈরি হওয়া মেশিন) আগুনের ফুলকি উড়ছে, হাতে হাতুরী লোহার সাবোলের উপর পুরনো জিনিস পত্র মেরামতে চলছে ঢুং ঢাং মুহুমুহু শব্দে। কথা হয় উপজেলার গাড়াগ্রাম ইউনিয়নের ঠাটারী কারিগর পেশার মানুষ ওহিদুল ইসলাম এর সাথে তিনি বলেন, দরিদ্র ঘরের সন্তান আমি। পিতার হাত ধরে আমার এই পেশায় আগমন। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে আর পিতাকে সাহায্য সহযোগিতা করতে এই পেশায় জড়িয়ে পড়ি। ওই সময় ঠাটারী পেশায় এতটাই কাজের চাপ ছিল দম ফেলার ফুরসত ছিলনা। স্বল্প পুঁজির ব্যবসায় সেই সময়ে প্রতিদিন আয় রোজগার হত ৬/৮ টাকার মতো। এখন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ২/৩ শত টাকার মতো আয় করা যায়। এই আয় দিয়ে বর্তমানে সংসার চলা একেবারেই দুঃসাধ্য ব্যাপার । সেই সব দিন আজ শুধুই স্মৃতি । এখন আর তেমন কাজ নেই অলস সময় কাটাতে হয়। অন্য কাজও জানিনা, বাধ্য হয়ে কোনরকমে এ পেশা ধরে রেখেছি।
তিনি আরো জানান, একটা সময় মানুষের গৃহস্থবাড়ির নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন- হারিকেন, ল্যাম্প( কুপি),বালতি, ড্রাম, তামার তৈরি স্প্রে মেশিন সহ নানা রকমের পণ্য সামগ্রী মেরামতের কাজ ছিল প্রচুর। সময়ের পথ-পরিক্রমায় মানুষের রুচিবোধের পরিবর্তনের সাথে সাথে মূলত প্লাস্টিকের ব্যবহার এসেই এ পেশায় ধস নেমেছে। আগে বাড়িতেই গৃহস্থালী ব্যবহারের অনেক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তৈরি করে বাজারজাত করা হত। তখন বাজারে এসব পণ্যের কদরও ছিল অনেক বেশি। এ উপজেলার ঠাটারী পেশায় জড়িত কারিগরদের সাথে কথা বলে এমনই চিত্র ফুটে ওঠে। দেশীয় ঠাটারী শিল্পের ব্যবসায় জড়িত লোকজনও এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য ব্যবসায় সংযুক্ত হয়েছে। ওই গ্রামের পুরনো বালতি মেরামত করতে আসা আব্দুল হাই বলেন, মানুষ এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে প্লাস্টিকের পণ্য সামগ্রীর উপর। আর এ শিল্প বাঁচাতে হলে দরকার আধুনিকায়নের।