Home » » অনাথ মেয়েদের অভয়াশ্রম “চাঁদমনি”

অনাথ মেয়েদের অভয়াশ্রম “চাঁদমনি”

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 13 February, 2020 | 2:00:00 PM

জলঢাকা প্রতিনিধি,চিলাহাটি ওয়েব : ‘চাঁদমনি আশ্রম’ অনাথদের দিয়েছে মাথা গোজার ঠাঁই। বাবা-মায়ের আদর-ভালবাসা, লেখাপড়ার সুযোগ। করেছে ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা। দিয়েছে জীবনের নিশ্চিত নিরাপত্তা। এটি চালাচ্ছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা পিজিরুল আলম দুলাল।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের চাওড়া ডাঙ্গী গ্রামের তিস্তা প্রধান খালের কোল ঘেষে চাওড়া ডাঙ্গী গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে চাঁদমনি আশ্রম। যেখানে আশ্রয় দেওয়া হয় অসহায় ও অনাথ বালিকাদের। আর এ চাঁদমনি এখন প্রায় ৫০ অসহায় ও অনাথ বালিকার ‘অন্ধের যষ্টি’। এখানে আশ্রয় নেওয়া বালিকাদের কারও বাবা নেই, কারও নেই মা। আবার কারও বাবা-মা কেউই নেই। পিজিরুল আলম (দুলাল)।
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার চাওড়াডাঙ্গী বালাপাড়া গ্রামে একজন সাদামনের মানুষ। ছিলেন উত্তরা ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক। তার ঘরে কোনো সন্তাান নেই। পৈত্রিকসূত্রে পাওয়া ১০ শতক জমিতে ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করে চাঁদমনি। এরপর থেকে এখানে আশ্রয় নেওয়া বালিকাদের মানুষের মতো মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করাটাই হয়ে যায় পিজিরুলের ধ্যানজ্ঞান। সে থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ জনের মতো অনাথ চাঁদমনিতে থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। এরপর কেউ চাকরি করছে আবার কেউ মনযোগী হয়েছে সংসারে। এদের মধ্যে ২ জন কৃতিত্বের সঙ্গে মাস্টার্স এবং ৬ জন অনার্স শেষ করেছেন। চাঁদমনিতে বর্তমানে থাকছে ৫০ জন অনাথ। তাদের পেছনে প্রতিমাসে খরচ হয় ৭০ হাজার টাকার মতো। এর পুরোটাই বহন করছেন পিজিরুল আলম এবং তার আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্খিরা। চাঁদমনির সার্বিক বিষয় দেখভালের জন্য রয়েছেন দুইজন পুরুষ শ্রমিক। রয়েছে দু’জন নারী বাবুর্চিও। প্রতিষ্ঠানটি এখনো কোনো ধরনের সরকারি সহযোগিতা নেয়নি।কথা হয় চাঁদমনির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলমের (দুলাল) সাথে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে উত্তরা ব্যাংক থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। তাকে স্ত্রী মোতাহারা আলম সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেছেন। কিন্তু ২০১০ সালে স্ত্রী মারা গেলে অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন তিনি।
পিজিরুল আলম বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৭৫ বছর। আমার মৃত্যুর পরও যেন চাঁদমনি ভালোভাবে চলতে পারে এজন্য ১১ সদস্য নিয়ে একটি পারিবারিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমার অবর্তমানে আমার ভাগ্নি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কণা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফাহমিদা টুম্পা এর দেখভাল করবেন।’চাঁদমনিকে আর্থিকভাবে যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই পিজিরুল আলমের। বিশেষ করে বোন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মাসুদা বেগম, ভগ্নিপতি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আবদুল কাদের ও চাচাতো ভাই ডা. শামীমের সহযোগিতা তাকে এ কাজে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। একইসঙ্গে তিনিও বিনা শর্তে যেকোনো ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহযোগিতা নেন। চাঁদমনিতে পাকা টিনশেডের ১০টি রুমে বসবাস করেন অনাথ বালিকারা। যেখানে রয়েছে শোয়ার ঘর, নামাজ ঘর, রান্নাঘর ও বাথরুম। খেলাধুলার জন্য পেছনে রয়েছে প্রশস্ত জায়গা। এখানে একটি বাউন্ডারি ওয়াল খুবই প্রয়োজন। লাইব্রেরি থাকলেও সেটি তেমন একটা সমৃদ্ধ নয়। সামান্য কিছু বই রয়েছে। সংগ্রহ শালায় পুরানো রেডিও, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘানি ইত্যাদি রাখা হয়েছে।প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক পিজিরুল আলম জানান, ২য় শ্রেণি থেকে অনাথ বালিকাদের নেওয়া হয়। এজন্য অনাথ বালিকা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হন তারা। শর্ত থাকে বাল্যবিয়ে দেওয়া যাবে না এবং আইএ পর্যন্ত থাকতে হবে। এছাড়া সমাজসেবার চিন্তা ও নিঃসন্তান হওয়ার কারণে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।জবা আক্তার (১৪)। বর্তমানে ৯ম শ্রেণিতে পড়ছে। চাঁদমনিতে আশ্রয় নেওয়া অন্য অনেকের মধ্যে সেও একজন।
নীলফামারীর ডিমলা থেকে ৯ বছর আগে এখানে আসে। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর চাঁদমনিতে আশ্রয় পায় সে। জবা বলেন, প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালককে আমরা সবাই মামা বলে ডাকি।জাকিয়া আক্তার (১৪) পড়ছেন এইচএসসিতে। তার বাবা নেই মা আছে।মায়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। সে এক বছর আগে এখানে আসে। তার মা আছে কিন্তু বাবা নেই। এখানে আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশ বালিকার অবস্থাই একই।পিজিরুল আলম দুলাল তার পেনশনের সব টাকা চাঁদমনির কাজেই ব্যয় করেছেন। এছাড়া তার পৈত্রিক ও নিজের প্রায় সবটুকু জমি চাঁদমনি প্রতিষ্ঠার কাজে দিয়ে দিয়েছেন। চাঁদমনির বার্ষিক ব্যয় প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকা।