Home » » সাদুল্যাপুর ও সুন্দরগঞ্জে ঘাঘট নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হাজারো পরিবার

সাদুল্যাপুর ও সুন্দরগঞ্জে ঘাঘট নদীর ভাঙনে নিঃস্ব হাজারো পরিবার

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 04 May, 2019 | 11:26:00 PM

ছাদেকুল ইসলাম রুবেল,গাইবান্ধা প্রতিনিধি,চিলাহাটি ওয়েব : ঘাঘট নদীর অব্যহত ভাঙনে সর্বশান্ত গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হাজারো পরিবার। কয়েক বছরের নদী ভাঙনে বিলীন হয়েছে ভিটেমাটি, বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও গাছপালাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব অনেক পরিবারের ঠাঁই হয়েছে অন্য জায়গায়। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে নদী ভাঙনের আতঙ্কে আছে কয়েকশ’ পরিবার। নতুন করে হুমকির মুখে বামনডাঙ্গা বাজার, রেল স্টেশন, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থাপনা। অন্যদিকে নদীর ডান ও বাম তীরের কুপতলা, পুরাণ লক্ষীপুর, জামুডাঙ্গা ও রসুলপুরসহ কয়েকটি স্থানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কয়েক বছর আগেই ধসে গেছে। বর্তমানে নদীর দুই তীরের বাঁধের অধিকাংশ স্থানই ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধই স্থানীয় এলাকাবাসীর যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম। ধসে যাওয়া অনেক স্থানে এলাকাবাসী নিজ উদ্যোগে মাটি ভরাট ও সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছেন। ভাঙন ঠেকাতে মানববন্ধন কর্মসূচিসহ বারবার দাবি জানিয়ে আসলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনও উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রংপুরের মিঠাপুকুর হয়ে আসা ঘাঘট নদী গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ ইউনিয়ন ও সাদুল্যাপুরের নলডাঙ্গা, দামোদরপুর, রসুলপুর, বনগ্রাম, কামারপাড়া ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে। নদীটি গাইবান্ধা জেলা শহর হয়ে মিশে গেছে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীতে। বছরে পর বছর ঘাঘট নদীর অব্যহত ভাঙনে দিশেহারা নদীর তীরের হাজারো মানুষ।সাদুল্যাপুরের পুরাণ লক্ষীপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. আনছার আলী বলেন,‘ঘাঘট নদীর অব্যহত ভাঙনে শত শত পরিবারের ভিটেমাটি, গাছপালা ও ফসলি জমি নদীতে চলে গেছে। বর্তমানেও ভাঙনের মুখে রয়েছে বেশ কিছু ভিটেমাটি ও ফসলি জমিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এছাড়াও তার বাড়ির সামনের ও পুরাণ লক্ষীপুর গ্রামের কয়েকটি পয়েন্টে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ধসে গেছে।’ এই বাঁধের ওপর দিয়েই তাদের শহরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয় বলে তারা বাঁধের ধসে যাওয়া স্থানে বাঁশ ও কাঠের সাঁকো তৈরি করেছে বলে তিনি জানান। পুরাণ লক্ষীপুর (হিয়ালী) গ্রামের পল্লী চিকিৎসক ডা. মো. শফিকুল ইসলাম বকুল বলেন,‘কয়েক বছরের অব্যহত নদী ভাঙনে কলেজ খেয়াঘাট থেকে হিয়ালী বাঁধের মাথা পর্যন্ত শত শত পরিবারের ভিটেমাটি, ফসলি জমি ও গাছপালাসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। এছাড়াও বহু বাড়িঘর ও ফসলি জমি হুমকির মুখে আছে।’ কামারপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ছামছুল হক মাস্টার বলেন, ‘নদীর ভাঙনে তার ইউনিয়নের কয়েক গ্রামের শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। ভাঙন প্রতিরোধসহ নদীর লুপ কাটিংয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এবার মুক্তিযোদ্ধা আনছার আলীর বাড়ির সামনের বাঁধসহ নদী ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প বরাদ্দ দিয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই ভাঙন এলাকা চিহ্নিত করে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’ ঘাঘট নদী ভাঙন রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক শহিদুর রহমান শহিদ বলেন,‘ঘাঘট নদীর ভাঙনে গত কয়েক বছরে গৃহহীন হয়েছে অনেক পরিবার। বিলীন হয়ে গেছে শত শত একর ফসলি জমি। ভাঙনের শিকার হয়ে অনেকে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সেই সঙ্গে এখন নতুন করে হুমকির মুখে পড়েছে বামনডাঙ্গা বাজার, রেল স্টেশন, শিক্ষা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্ষা মৌসুমের আগেই স্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানো না গেলে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে। এছাড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা রয়েছে। কোথাও কোথাও বাঁধ ধসে নদী গর্ভে চলে গেছে। বামনডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজমুল হুদা বলেন,‘ভাঙন রোধে ইউনিয়ন পরিষদের বরাদ্দ দিয়ে কিছু জায়গায় মাটি ভরাটের কাজ করা হয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে বাড়িঘর, আবাদি জমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বিলীন হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন নিরব ভুমিকা পালন করছে। ভাঙনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে বারবার আবেদন করেও কোনও প্রতিকার মেলেনি। ’ এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন,‘সাদুল্যাপুর উপজেলার পুরাণ লক্ষীপুর গ্রামের নদীর তীর ও বাঁধ মেরামতের জন্য বরাদ্দের দেওয়া হয়েছে। দ্রুত টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কাজ শুরু করা হবে। এছাড়া বামনডাঙ্গার কুঠিপাড়া এলাকায় ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এমপির ডিও লেটারসহ বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘাঘট নদী ও বাঁধ মেরামতের বরাদ্দ চেয়ে কয়েকটি প্রস্তাবনাও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এসব প্রস্তবনা বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব প্রস্তাবনাগুলো অনুমোদনের চেষ্টা করা হচ্ছে।’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) মো. মাহাবুবুর রহমান জানান, গাইবান্ধা শহর থেকে সাদুল্যাপুর ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পর্যন্ত ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ডানতীরে ২৫ কিলোমিটার ও বামতীরে ৩৩ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে ৫-৭টি পয়েন্ট অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯৯০ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে নির্মিত এসব বাঁধ বর্ষায় ও জরুরি সময়ে মেরামত করা হয়। তবে স্থায়ীভাবে মেরামত ও সংস্কারের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে বাবার লিখিত আবেদন করা হলেও কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।’ তবে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই এসব বাঁধের চিহ্নিত কিছু এলাকায় কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তবে শুধু আশ্বাস নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভাঙনের কবল থেকে নদী পাড়ের মানুষকে রক্ষায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার ও স্থায়ী প্রতিরোধসহ কার্যকর ব্যবস্থা নিবেন এমনটাই দাবি এলাকাবাসীর।