Home » » অনন্ত- অন্তরা >> দশম পর্ব

অনন্ত- অন্তরা >> দশম পর্ব

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম : 13 October, 2018 | 1:06:00 AM



























॥ সৈয়দ মিজানুর রহমান ॥ 

লজ্জায় লাল হয়ে আছে অন্তরা, এইভাবে জীবনে কখনও কোন ছেলের সাথে সে দেখা করেনি- অন্তরা নিজেকে ধরে রাখতে পারছেনা-সে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করছে কেন আমার এমন হচ্ছে? কত ছেলেদের(ক্লাস মেড) সাথে প্রতিদিন এখানে এসে কথা বলি গল্প করি কিন্তু এমন তো কখনও আমার হয়নি- তাহলে আজ কেন? শ্বাস ঘন হয়ে আসছে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে অথচ সবাই বলে আমি ভীষণ সাহসী, কেউ কেউ বলে আমি নাকি বাঘিনী পারফেক্ট স্মার্র গার্ল তাহলে আজকের এই আমি কে আমি? কোথায় ছিল লুকিয়ে এই অচেনা আমি? ভাবনার খিড়কির কড়া বেজে ওঠলো একটি ভরাট কণ্ঠ ওর নাম ধরে ডাক দিলো- বলল – অন্তরা আপনি কেমন আছেন? হঠাৎ সারা শরীরে বিজলী চমকে গেল তার তেজস্ক্রিয়ায় অসাড় হয়ে গেলো অন্তরা জবাব দেওয়ার শক্তি নির্বাক নিস্তব্ধতার বোবা বন্দীখানার কয়েদী হয়ে নিথর দাঁড়িয়ে রইল – পাশে থাকে তাকিয়ে যতটুকু দেখা যায় উড়নার আড়াল থেকে অনন্ত মায়াভরা চোখ মেলে তার স্বপ্নের বাস্তব অবয়ব- স্বপ্নের মোহিত খুশবো চক্ষু বুজে মিলিয়ে নিতে চেষ্টায় বিভোর- গত রাতের সেই মাদকতা, মোহিত খুশবো, আড়ালে রাখা মুখখানি যতটুকু তার দেখা সব যেন সেই মেয়ে এই মেয়ের প্রতিচ্ছবি !!! এ কী দেখলো সে বিস্মিত চোখে নয়ন মেলে ধরতে চাইলো আবার! সাথে সাথে অন্তরা মুখ ঘুরিয়ে নিলো আবার, অনন্তের বুঝতে বাকী রইলো না- তার এই ভাবনায় চোখের পাতা বুজে আসার সময় অন্তরা দেখে নিয়েছে অনন্তকে- কী এক অনুপম আর্ট ছিল মুখখানা ঘুরিয়ে নেবার সময় অনন্তের চোখ এড়াতে পারেনি । প্রশান্তির বরষণ ঝর ঝর বইতে লাগলো তীব্র খরায় পোড়া হৃদয়ের জমিনে- রিমঝিম রিমঝিম বরষনে উদাসী বনে প্রেমের মৃদু শীতল হাওয়া দিলো বহিয়ে- অনন্তর চোখ জোড়া স্থির হয়ে আছে অন্তরার দিকে পলকহীন আরো একটু কাছে গিয়ে ভীষণ আদুরে কন্ঠে ডাকে অন্তরা বলে- হুম বলে সাড়া দিয়ে একটু সরে দাঁড়ালো । মিষ্টি হাসি লেগে আছে ঠোঁটে বুঝতে পারলো । এবার অন্তরা বলল-
কেমন আছেন আপনি ? এখানে চিনে আসতে কষ্ট হয়নি তো? বলতে বলতে আবার বলল চলুন আমরা ঐখানটার ঘন ছায়া গিয়ে বসি- এখন ভালো আছি- না কোন সমস্যা হয়নি দিব্যি টেনে নিয়ে এসছে আমাকে(দুজনে হেটে হেটে ঐ বসার জায়গার দিকে এগোচ্ছে)। মানে?
 মানে বুঝলেন না- যে যাদুটোনা আমাকে পাঠিয়েছিলেন সেই যাদুর তোড়ে আমি এখানে পৌছে গিয়েছি ।
 ও আচ্ছা – হি হি হি – তাহলে তো হোঁচট খাওয়ার কথা- সেটা নিশ্চয় খেয়েছেন?
আলবদ খেয়ে তারপর এই এখানে এসেছি-
ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞাসা তার মানে আপনি সত্যি সত্যি হোঁচট খেয়েছিলেন?
 হ্যাঁ সত্যি হোঁচট খেয়েছিলাম?
 কিন্তু কেন?
জানিনা – এমন তো হওয়ার কথা নয়! তবু কথা রাখেনি সময়! হয়ে গিয়েছিল ।
ব্যথা পাননি তো আবার?
একটু তো পেয়েছি- কোন সমস্যা না, এখন ঠিক আছি ।
হি হি হি – আবার হেসে উঠলো অন্যদিক ফিরে, অসম্ভব মিষ্টি তার হাসি!! হৃদয়ে লেপ্টে যায় সেই হাসির আনন্দময় আদুরে আওয়াজ! অন্তরা বসতে বসতে বলল- বসে পড়ুন এখানে- সবুজ ঘাস এই বয়সের কার্পেট তাই না?
 হ্যাঁ ঠিক তাই- কিন্তু আপনি এখনও নিজেকে আড়াল করে রাখছেন কেন? আমাকে ডেকে নিয়ে এসে রীতিমত লজ্জা দিচ্ছেন দেখছি- না না আপনাকে লজ্জা দেওয়াটা মুখ্য বিষয় নয়- আমি এখনো স্বাভাবিক হতে পারছি না – সেইজন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত বন্ধু । মুখোমুখি বন্ধু শব্দ উচ্চরণের জন্য-বন্ধু শব্দটির সম্পর্ককে গরম চায়ের পরিবেশনের মধ্যদিয়ে সেলিব্রেট করি, কি বলেন? বাহ্ দারুণ আইডিয়া সাথে আর কী আছে আশেপাশে? ওহ ! ঐ দেখুন বাদামওয়ালা ডাকুন পিচ্ছিকে ।
গরম চায়ের পরিবেশন সাথে টাটকা বাদাম ভাঁজা আর বিটললবন—বলতে বলতে বাদামওলাকে ডেকে বাদাম আর বিটলবন নিয়ে সম্মুখে ঠোঙা খুলে বিছিয়ে দিলো বাদামগুলি সাথে বিটলবন খুলে তার কাছের দিকটায় রেখে বলল এবার খেতে খেতে কথা বলা যাক কেমন?
 জ্বী- ঠিক বলেছেন, তবে আমি সেই সময় থেকে ভাবছি আপনার সাথে দেখা হলে কিভাবে শুরু করবো সেই কথা যার জন্য এই দেখা করা- তবে প্রথমেই ক্ষমা চাইছি না বুঝে আপনাকে অনেক কষ্ট দেওয়ার জন্য, কিন্তু আমার কোন উপায় ছিল না কারণ বাস্তবতার কষাঘাতে আমি অনেক বেশী বাস্তবমুখী হয়ে উঠেছি- এই জন্য আমি দায়ী নই সময়ের সমন্বয়ে বাস্তবতা দায়ী ।
আমি বাস্তবতা বুঝি, তবে অনুভবের কাছে কিভাবে যেন বার বার পরাস্ত হয়ে যাই । ভালবাসার নামে যে অনুভব আমাকে নিবিড়, গাঢ় থেকে প্রগাঢ় কী এক মন্ত্রে বশীকরণ করে সেই মানুষীর দিকে চালান করে দেয়- আমি নির্দিধায় অনায়াসে অচেনা পথে চেনা ছায়া মূর্তির পানে ছুটে চলি মুখশ্রী আবিষ্কারের জন্যে ।
আমি তো সেই মানুষটির জন্য আজো ঘুরে ফিরি- যে শরীরে নয় হৃদয়ে রবে নিশাতুর- এই দেহে রবে শ্বাস যতদিন, যে মানুষটি ভালবাসতে জানে, বিশ্বাসের জন্ম দিতে পারে, পারে আত্মবিশ্বাস সুদৃঢ় করে নির্ভরশীল করে তুলতে, দায়ভার, দায়ীত্বশীলতা শ্রদ্ধাভর ভালবাসার সোনালীদিক উম্মোচন করে প্রতিনিয়ত নতুন স্বাদের স্বপ্ন জাগাতে পারে- এমন একজন মানুষ আমি খুঁজি । যেমন মানুষটির আপনি স্বপ্ন দেখেন- সেই স্বপ্নের মানুষটিকে আপনি হৃদয়ের রংতুলিতে যে ভাবে সাজিয়ে তোলেন এবং দেখেন- সেই মানুষটির স্বাধীনতার কথাগুলি কোথায় লিখেছেন বা লিখে রেখেছেন? নাকি স্বাধীনতা বলতে আদর করে সোনার শিকলে বেঁধে রেখেছেন? অথবা আপনার সংবিধানে স্বাধীনতা, অধিকার তারজন্য কতটুকু রেখেছেন? যদি আমাকে জানাতেন ভীষণ খুশী হতাম ।
এতো স্বপ্ন এতো ভালবাসা
হৃদয় নিংড়ানো উষ্ণতায় জড়ানো
আশা ভরসা স্বপ্ন দেখা রাজকন্যা
সম্মুখে যখন এলো- ঢালি ভরে এলো নিয়ে
ফুল নয় প্রশ্নগুলি জীবনের নিশ্চয়তার!
জানিনা কেন আজ নিরাশার বালুচরে
বৃষ্টির আগমনে সেজেছে ধূসর মেঘ,
উজান গাঙে বৈঠা হাতে এ কোন্
প্রত্যয় কূলে ভিড়িবার-
আপনি যে প্রত্যাশাগুলি ব্যক্ত করেছেন ঐ একি প্রশ্ন আমারও যদি মিলে যায় সোনায় সোহাগা- তবে একটি জায়গা আপনাকে আমি একটি অভয় দিয়ে নিশ্চিত করতে চাই- সেটা হলো অধিকার আর স্বাধীনতা- অধিকার সম দুজনের ভালবাসায় সুষমবন্টন- স্বাধীনতা হলো দু’জন দু’জনে পোষাক সম অধিকারের ভিত্তিতেই- দু’জনের আত্মতৃপ্তিতেই, নিগুঢ় ভালবাসার সুদৃঢ় বন্ধনে বিশ্বাসের মালা গেঁথে দু’জন দুজনকে পরাবো হেরে যাওয়ার বাসনায় ভালবাসার অমৃত সুধা পানে ।
 চোখে চোখ রেখে হৃদয়ে ঢোক গিলছিল আর নিখুঁত দাঁড়িপাল্লায় মেপে নিচ্ছিল কড়ায় গন্ডায় হিসেব করে হঠাৎ চোখ যখন ভরে এসছিল জলে তখনই নিচু হয়ে নিজেকে লুকালো । চোখে ময়লা পড়ার ছলে চোখ নিলো মুছে- মুছতে মুছতে বলছিল এই তোমাকেই খুঁজছি এতদিন মনে মনে- রেশমি চুল হাতদিয়ে সরিয়ে গ্রীবা কাত করে মোহনীয় দর্শনে নিজেকে উপস্থাপন করে মুখখানি তুলে ধরলো মুচকি হাসির বন্ধনে ।
যদি আপনার কথাগুলি সত্যিই মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বলে থাকেন তাহলে মনের দর্শন বাস্তবতায় এলো বুঝি ধরা দিতে । এমনি একটি বাস্তবতা আমি খুঁজে চলেছি-
আমি ঠিক বুঝেও বুঝতে পারছি না – ঠিক আমায় দিয়ে আপনি কী বুঝাতে চেয়েছেন? কথাগুলি আলোচনা এবং মত বিনিময় – এই কথাগুলি বইয়ের পাতায় আছে ছাপানো-
আমি জানি- বইয়ের পাতায় ছাপানো থাকলেই তা বাস্তবতায় কয়জন মেনে চলে বা বিশ্বাস করে?
আমি এখানে বুঝাতে চেয়েছি যে বিশ্বাস করে মনে প্রাণে- সেই মানুষের সন্ধানের কথা আমি মোটা দাগে আন্ডার লাইন করেছি । করেছেন বেশ ভালো, শুনে ভালো লাগলো- কিন্তু সেখানে ভোরের আলোয়ে শিশির ফোঁটা সোনালী আলোয়ে ঝলমল করে জ্বলবে না- তার আগেই শিশির ফোঁটা দমকা হাওয়ায় ঝরে পড়বে মাটিতে- শুষে নেবে মাটি, মাটি থেকে শিকড়- হবে সঞ্চালন বেদনা উপলব্ধির শিরা উপশিরায় ।
এ দেহের প্রাণে দাগ কেটেছে,
ভাবনার শহর আলো ঝলমল
দহন দ্রোহে জ্বলছে ।
হে মোর প্রাণেশ্বর-
তুমি আছো যেথা মন মোর সেথা/ ডুবে ডুবে অমৃত সুধা পানে ।
আজ আমি আপনাকে ডেকেছি সেই সত্য বলার সনে মিথ্যার প্রস্থানে- 
ভেবো না তুমি
যা ভেবেছো তুমি মনে মনে
 রেখেছো যারে তোমার নয়নে নয়নে
 সে ছিল সে আছে তোমারই পরাণে
ভীষণ গোপনে ।
আমি বিবাহিতা নই বন্ধু – আমি সেই- আপনার বন্ধু হতে চাই – যে বন্ধু আপনি এতদিন খুঁজে এসেছেন ।
অনন্তর ছলছল আঁখি দুটি আকাশ পানে রইল চাহিয়া অশ্রু গেল গড়াইয়া, মনে হল আকাশের চাঁদ আজ সে হাতে পেয়েছে, মনে হল ঐ রূপালী চাঁদ নিজ থেকে সত্যি সত্যি ওর কাছে ধরা দিয়েছে কত যন্ত্রনা, বেদনার অবসান ঘটিয়ে, অবিশ্বাসের কাঠকুঠি পুড়িয়ে ছাই উড়িয়ে রতন খুঁজে নিল সে ।
এখন পর্যন্ত অন্তরাকে ঠিক মতো দেখেনি এতো কাছাকাছি বসেও ভালো করে দেখার ইচ্ছে থাকা সত্যেও দেখার চেষ্টা করেনি যে ভাবে প্রেয়সীকে দেখে কারণ যদিও সে তার ভালবাসার মানুষ তবুও সে অন্যার স্ত্রী, তার ভালবাসা তার কাছে অম্লান অটুট থাকুক যেমনটি এতদিন ছিল গোপন অন্তরকক্ষে প্রেমের অভিসারে একাকীত্বের কুঞ্জবনে শরতের কাশবনে আগুনরঙা গোধূলিবেলার হাওয়ায় দুলে দুলে । কিন্তু এখন যেন তার আর তোর সইছে না- ভাবছে মনে মনে এতদিন যে অন্তরা ছিল শুধু অন্তরে সে আজ বাহিরে আমার অপেক্ষায় আছে বসে! পরাণ ভরিয়া দেখিব তারে । 

-------- ১২/১০/২০১৮ ইং । 
চলবে-------