Home » » আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

আজ আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম News Editor : 01 May, 2017 | 1:02:00 AM

                                                       ॥ খন্দকার সাগর আহম্মেদ ॥
 আজ ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। প্রতি বছর এ দিনটি আমাদের মাঝে আসে ঐক্যের বার্তা নিয়ে। বছরের এই দিনটিকে আমরা যথাযোগ্য মর্যাদায়, বিপুল উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে পালন করে আসছি। এই দিনটি এলেই আমরা স্লোগানে মুখরীত করি শহরের রাজপথ অলিগলি, দুনিয়ার মজদুর এক হও স্লোগান দিয়ে। আসলে আমরা কি এক হতে পেরেছি? না কি এদিনটি এলেই আমরা এক হই। সেই ১৮৮৬ সাল থেকে অদ্যাবধি আমরা একই স্লোগান দিয়ে আসছি। এখনো শ্রমিক নির্যাতন, নিপীড়ন, অত্যাচার চলছে। আজ এত বছর পার হয়ে গেলেও প্রকৃত পক্ষে শ্রমিকের ভাগ্যের কোন উন্নতি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যে শ্রমিকরা আজকের পহেলা মে দিবসে স্লোগানে স্লোগানে মুখরীত করছে শহরের রাজপথ অলিগলী, তাদের অনেকেই জানেনা ১লা মে দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য। মে দিবসের প্রকৃত ইতিহাস বেশির ভাগ শ্রমিকের জানা নেই। শ্রমিকদের কথা এ জন্যই বলছি, যেহেতু মে দিবস আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পরিচিত। আমরা অনেকেই একটি মাত্র বাক্য মুখস্ত করে রেখেছি, তা হলো ১৮৮৬ সালের ১লা মে তারিখে আমেরিকার হে মার্কেটে ৮ ঘন্টা কাজের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে অনেক শ্রমিককে গুলি খেয়ে জীবন দিতে হয়েছিল। সেই থেকে এই দিনটির জন্ম। প্রকৃত পক্ষে এটি পূর্নাঙ্গ ইতিহাস নয়। ১লা মে দিবসের তাৎপর্য জানতে হলে আমাদেরকে অনেক পিছনের দিকে যেতে হবে। ১৮৮৬ সালের ১লা মে দিবসে শুধু শ্রমিকরা একদিনে এক হয়ে আন্দোলন করে এই দিনটির জন্ম দেন নাই। তার বহুযুগ আগ থেকে বিভিন্ন শ্রমিকরা বিভিন্ন সময় আন্দোলন করতেছিল। সেই সময় তাদের আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে নাই। তবে সে আন্দোলনের মুল চেতনা থেকে ১৮৮৬ সালে একত্রিত হতে পেরেছিল সকল শ্রমিক। তারই ধারাবাহিকতা আজকের এই ১লা মে দিবস। ১৮০৬ সালে আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার জুতো শ্রমিকরা কাজের সময় কমানোর দাবিতে ধর্মঘট করে। প্রথম পদক্ষেপে তারা সফলতা আনতে পারে নাই। আন্দোলনে আন্দোলনে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘদিন। আস্তে আস্তে তারা সংগঠনকে বৃহৎ আকার করেছিল। তাই দুনিয়ার প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করা হয়েছিল ফিলাডেলফিয়ায় ১৮২৭ সালে। ১৮২৩ সালে বঙ্গদেশে পালকীর ব্যাপক প্রচলন ছিল। পালকী বেহারারা কর্ম বিরতি পালন করেছিল। তাদের কর্ম সময় কমানোর দাবিতে। পুুজিপতিরা এই পালকী বেহারাদেরকে ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা খাটাতো তাই তারা ১০ ঘন্টা কাজের দাবিতে কর্ম বিরতী পালন করেছিল। ১৮৩৪ সালে নিউইয়ার্ক এর রুটি কারখানার শ্রমিকরা ১০ ঘন্টা কাজের দাবিতে দীর্ঘদিন ধর্মঘট করে। রুটি কারখানার শ্রমিকদেরকে সারাদিন আগুনের কাজ করতে হত। আগুনের ঝাঁঝে চোখ মুখ তাদের কয়লার মত হত। তথাপিও তাদেরকে ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা কাজ করতে হত। তাই এই শ্রমিকরা ধর্মঘট করে। ১৮৩৫ সালে আরো একটি ধর্মঘট পালিত হয়েছিল। নদী পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা এই ধর্মঘট পালন করেছিল। ১৮ থেকে ২০ ঘন্টা তাদেরকে কাজ করতে হত। তাই তারা সময় কমানোর দাবিতে আন্দোলন করেছিল। এ আন্দোলনের কোন সংগঠিত রুপ ছিল না বিধায় তাদের আন্দোলনে সাফল্য আসেনি। ১৮৬২ সালের মে মাসে এই বঙ্গদেশে অর্থাৎ বর্তমান ভারতের তৎকালীন হাবড়া রেলওয়ে কোম্পানীর ১২০০ জন মজুর কাজে যোগ না দিয়ে ১২ ঘন্টা কাজের পরিবর্তে ৮ ঘন্টার দাবিতে ধর্মঘট করে। রেলওয়ে কোম্পানী অবশ্য তাদের দাবিকে মেনে নিয়েছিল। রেলওয়ে শ্রমিকরা তাদের আন্দোলনে সফলতা এনে ছিল। ১৮৭৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খনি শ্রমিকরা তাদের কাজের সময় কমানোর দাবিতে ধর্মঘট পালন করেছিল। মার্কিন সরকার তখন ১০ জন শ্রমিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যু দন্ড কার্যকর করেছিল। এই ১০ জনকে ফাঁসিতে ঝুলানোর উদ্দেশ্য ছিল যাতে করে অন্য কেউ ধর্মঘট করার সাহস ও শক্তি না পায় এবং তাদের আন্দোলন বানচাল হয়। এভাবে যুগ যুগ ধরে আন্দোলন চলতে থাকে। বুলেট, বোমা, গুলি, ফাসি কোনটি শ্রমিকদেরকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে শ্রমিকরা এভাবে যুগ যুগ ধরে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। ১৮৮৬ সালের ১লা মে শনিবার কোত্থেকে যে হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কর্মস্থলে না গিয়ে মিশিগান এভিনিউতে আসতে লাগলো। সবাই অবাক, অবাক আমেরিকান সরকার সহ পুলিশ বা ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী। দেখতে দেখতে প্রায় ৩ লক্ষাধিক শ্রমিক এসে হাজির হল মিশিগান এভিনিউতে। লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের প্রতিবাদী কন্ঠস্বরে লেকফ্রন্ট এর আকাশ বাতাশ প্রকম্পিত হতে লাগল। মিছিল শেষে শুরু হলো বক্তৃতা। কোন হৈ চৈ নাই। বিশৃঙ্খলা নাই সেই অনুষ্ঠানে। পিন পতন শব্দটুকুও নেই সেখানে। দুরথেকে দাড়িয়ে দাড়িয়ে পুলিশ বা ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী বক্তৃতা শুনছিল। কোন প্রকার বাধাও দিল না তারা। খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে সভা সমাবেশটি শেষ হল। এক ধাপ এগিয়ে গেল আন্দোলনরত শ্রমিকরা। ৩রা মে ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার ওয়ার্কসের শ্রমিকরা ধর্মঘট করতে ছিল। পুলিশ বাহিনী তাদের ধর্মঘট ভাঙ্গার জন্য অত্যাচার শুরু করে। ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার ওয়ার্কসের শ্রমিকরা সবাই জোট বেধে পুলিশ বাহিনীকে মেকাবেলা করতে গেলে, পুলিশ বাহিনী তাদের উপর চড়াও হয় এবং গুলি করে ৬ শ্রমিককে হত্যা করে। পাশেই একটি ছ মিলের কারখানায় আন্দোলনরত শ্রমিকদের মিটিং চলছিল। সেই মিটিং এ উপস্থিত ছিল অগাষ্টে স্পাইজ, আলবার্ট পারসন, স্যামুয়েল ফিলডন, জর্জ এঞ্জেল, এডলফ ফিসার, লুই লিগ্ন, অস্কার নীবি ও মাইকেল শোয়াব। অগাষ্টে স্পাইজ সেই মিটিং এ বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। অগাষ্টে স্পাইজ ছিল সেই সময়ের তুখোড় শ্রমিক নেতা। ম্যাককর্মিক হার্ভেস্টার শ্রমিকদের উপর পুলিশ বাহিনীর নারকীয় হত্যা কান্ড নিজের চোখে দেখতে পেলেন অগাষ্টে স্পাইজ। তিনি এই নারকীয় হত্যাকান্ডের জোর প্রতিবাদ জানালেন। এবং পরের দিন ৪ঠা মে মঙ্গলবার শিকাগোর ডেসল্পেনস ও হল ষ্ট্রেডষ্ট্রীট এই দুইয়ের মাঝ খানে র‌্যানডফ ষ্ট্রীটের ‘হে মার্কেট’ স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৩রা মে সোমবার এর নারকীয় হত্যা যজ্ঞের প্রতিবাদ সভা। সভায় হাজার হাজার শ্রমিক উপস্থিত হয়ে আস্তে আস্তে সভাটি জন সমুদ্রে পরিণত হল। উক্ত সভায় শিকাগোর মেয়র কাটার হ্যারিসন উপস্থিত ছিলেন। সভাটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। হঠাৎ কাটার হ্যারিসন পুলিশের দিকে ইঙ্গিত করে সভা থেকে চলে যেতে বললেন এবং তিনি নিজেও সভা থেকে চলে গেলেন। কিছুক্ষন পর শিকাগোর পুলিশ জনবনফিল্ড তার বিশাল পুলিশ বাহিনীসহ সভাস্থলটি ঘিরে ফেলেন এবং আক্রমন চালালেন শ্রমিকদের উপর। হঠাৎ কোথা থেকে একটা বোমা এসে পড়লো সভাস্থলে। আর যায় কোথায় জনবনফিল্ড বাহিনীর সৈন্যরা এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষন করলো সভাস্থলের শ্রমিকদের উপর। গোলাগুলিতে নিহত হলো ১২ জন পুলিশ সার্জন, ৭ জন পুলিশ ও ৪ জন শ্রমিক। পুলিশ বাহিনী যাকে কাছে পেলো তাকেই গ্রেফতার করলো। গ্রেফতার হলো ৭ জন শ্রমিক নেতা। দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত হলো ‘প্রত্যেকটি ল্যাম্প পোষ্ট কমিউনিষ্টের লাশ দ্বারা সজ্জিত করা হোক’। বুর্জোয়া পত্রিকাগুলো শ্রমিকদের ফাঁসি দাবি করেছিল। বিচার শুরু হয় ১৮৮৬ সালের জুন মাসে এবং রায় ঘোষনা করা হয় মৃত্যুদন্ড। কার্যকর করা হয় ১১ ই নভেম্বর ১৮৮৭ সালে। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হলো ৪ জনকে ২ জনকে মৃত্যুদন্ড রদ করা হয়, অস্কার নিবের যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুললো যারা তারা হলেন- অগাষ্ঠ স্পাইজ, আলবার্ট পারসন্স, জর্জ অ্যানজেল ও অ্যাডলফ ফিশার। এই ঘটনার পর ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন প্রস্তাব করলো ৮ ঘন্টা কাজের দাবি সমর্থিত হলো। দীর্ঘ ২ বৎসর ১০ মাস পর অর্থাৎ ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই বাস্তিল দূর্গের পতনের শত বার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ প্যারিসে জমায়েত হলেন এবং কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিক এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠনের অনুরুপ আর একটি সংগঠন গড়ে তুললেন। এই সংগঠনটি দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নামে পরিচিত। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার পর পর কংগ্রেসের প্রথম সম্মেলনে দুনিয়ার সর্বত্র শ্রমিকদের সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে মে দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮৯০ সাল থেকে দুনিয়ার সব দেশেই মে দিবস পালিত হয়ে আসছে। আমাদের মনে রাখতে হবে আন্তর্জাতিক মর্যাদা দিল যে দিনটি সেটি হলো ৪ঠা মে, ১৮৮৬।
শেয়ার করুন :