Home » » বিশ্ব মা দিবস ঃ মায়ের সম্মান ও মর্যাদা

বিশ্ব মা দিবস ঃ মায়ের সম্মান ও মর্যাদা

চিলাহাটি ওয়েব ডটকম News Editor : 14 May, 2017 | 12:50:00 AM

                             ॥ ড. মোঃ জালাল উদ্দীন মোল্লা ॥ 
আজ রবিবার “বিশ্ব মা দিবস”। মায়ের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখাসহ মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসা এবং দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বিশ্বের অপরাপর দেশগুলোর মত নানা আয়োজনে আমাদের দেশেও দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে ‘উৎকৃষ্ট উপাদানের সমন্বয়ে সুন্দরতম অবয়বে’ (আল-কুরআন- ৯৫ ঃ ৪) নারী ও পুরুষ হিসেবে স্বতন্ত্র রূপে সৃষ্টি করেছেন এবং ‘আশরাফুল মাখ্লুকাত’ তথা ‘সৃষ্টির সেরা জীব’ ঘোষণা করে তাঁর ‘খলিফা বা প্রতিনিধি’ হিসেবে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তবে মানুষকে ‘দুর্বলতম ও অসহায় প্রাণী’ হিসেবেও সৃষ্টি করা হয়েছে (আল-কুরআন- ৭০ ঃ ১৯)। মহান আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে যে ‘দুর্বলতম ও অসহায় প্রাণী’ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তার প্রমাণ হচ্ছে- মনুষ্যতর প্রাণিগুলো (যেমন- গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস, মুরগি প্রভৃতি) বাচ্চা প্রসবের পরপরই সদ্যজাত বাচ্চাগুলো উঠে দাঁড়ানোসহ নিজে নিজেই চলাচল ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজগুলো করতে পারলেও কিন্তু জন্মগ্রহণের পর মানবশিশু একান্ত অসহায় প্রাণী হিসেবে কিছুই করতে পারে না। বরং স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে জন্মের পর মানবশিশু মাতৃদুগ্ধ পান করেই যেমন বেঁচে থাকে এবং জীবন-ধারণ করে থাকে, তেমনি দীর্ঘ সময়ব্যাপী পিতা-মাতার যৌথ প্রচেষ্টা ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে মানবশিশু ধীরে ধীরে বড় এবং স্বাবলম্বীও হয়ে থাকে। তবে মানবশিশুকে স্বাবলম্বী করে তুলতে অন্যান্য প্রাণিগুলোর তুলনায় মানুষের অনেক বেশি সময় লাগে। আর সন্তান প্রতিপালন ও প্রতিরক্ষণসহ সন্তান এবং নিজের (মায়ের) নিরাপত্তার জন্যই এ সময়টিতে মাকে তথা নারীকে পুরুষের (স্বামীর) আশ্রয়ে থাকতে হয়। মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়ব্যাপী সন্তান প্রতিপালন ও প্রতিরক্ষণসহ সন্তান ও মায়ের নিরাপত্তার জন্য মা-বাবা একত্রে থাকা তথা স্ত্রী-স্বামীর আশ্রয়ে থাকা প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম তথা মহান আল্লাহ্ তা’আলা প্রদত্ত এক বিশেষ নিয়ামত তথা দান। অথচ ভেবে দেখুনতো, মনুষ্যতর প্রাণিগুলোর মত যৌন মিলনের অব্যবহিত পরেই যদি মানুষের স্ত্রী-পুরুষ তথা স্বামী-স্ত্রী পরস্পর থেকে পৃথক হয়ে যেত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত, তাহলে মা ও তার সন্তানকে কতইনা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হত! তাছাড়া মা তার গর্ভজাত সন্তানটির পিতৃ পরিচয়ইবা কি দিতেন? সেকারণে ইসলামে (কুরআন ও সুন্নাহ্য়) নারীর মাতৃরূপের উপরই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামে চাওয়া হয়েছে, নারী হবে সুমাতা ও সুগৃহিনী। কেননা, মেয়েরাই সুমাতা হিসেবে যেমন সন্তান লালন-পালন করে থাকেন, তেমনি আবার সুগৃহিনী হিসেবে সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পারিবারিক জীবনের ভিত্তি এবং সোপানও রচনা করে থাকেন। তাই পিতা-মাতার সেবা-যতœ করাসহ পিতা-মাতার সাথে সদয় আচরণ তথা সদ্ব্যবহার করার জন্য কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়ে মায়ের সম্মান-মর্যাদা এবং পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ তা’আলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন- আমি (আল্লাহ্্) মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে অত্যন্ত কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট করে প্রসব করেছে। আর তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও স্তন ছাড়াতে ত্রিশ মাস সময় লেগেছে (আল-কুরআন- ৪৬ ঃ ১৫)। এবং- আর আমি (আল্লাহ্্) মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। তার দুধ ছাড়ানো দু’বছরে হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে, আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই নিকট ফিরে আসতে হবে (আল-কুরআন- ৩১ ঃ ১৪)। মহান আল্লাহ্ তা’আলা আরও বলেছেন- আমি (আল্লাহ্) মানুষকে তার পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার জন্য জোর নির্দেশ দিয়েছি (আল-কুরআন- ২৯ ঃ ৮)। মহান আল্লাহ্ তা’আলা এও বলেছেন- তোমার পালনকর্তা (আল্লাহ্্) আদেশ করেছেন যে, তাঁকে (আল্লাহ্্) ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর। তাদের মধ্যে কেউ (মাতা বা পিতা) অথবা উভয়ই (মাতা-পিতা) যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়; তবে তাদেরকে ‘উহ্’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে (মাতা-পিতা) ধমক দিও না আর তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণ কথা বল ও আচরণ কর (আল-কুরআন- ১৭ ঃ ২৩)। এবং- আর উপাসনা কর আল্লাহ্্র, তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করো না। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয় আল্লাহ্ দাম্ভিক-গর্বিতজনকে পছন্দ করেন না (আল-কুরআন- ৪ ঃ ৩৬)। সর্বোপরি পিতা-মাতার জন্য দোয়া করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন- তাদের (মাতা-পিতা) সামনে ভালোবাসার সাথে, নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলঃ হে আমার রব (আল্লাহ্)! তাদের (মাতা-পিতা) উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা (মাতা-পিতা) আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন (আল-কুরআন- ১৭ ঃ ২৪)। এবং- হে আমাদের রব (আল্লাহ্)! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যারা মু’মিন হয়ে আমার গৃহে প্রবেশ করে তাদেরকে এবং মু’মিন পুরুষ ও মু’মিন নারীদেরকে ক্ষমা করুন এবং যালেমদের কেবল ধ্বংসই বৃদ্ধি করুন (আল-কুরআন- ৭১ ঃ ২৮)। ইসলামী শরিআহ্ তথা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে মহান আল্লাহ্ তা’আলা এবং তাঁর রাসুলের পরপরই এ পৃথিবীতে অধিক সম্মান-মর্যাদা, সদাচরণ তথা সদ্ব্যবহার ও সেবা-যতœ পাবার যোগ্য হলেন পিতা-মাতা। মায়ের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকার প্রসংগে জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে রাসুলুল্ল¬াহ্ (সঃ) পর পর তিন বার বলেন- তোমার নিকট অধিক হকদার হলেন তোমার মাতা; তোমার নিকট অধিক হকদার হলেন তোমার মাতা; তোমার নিকট অধিক হকদার হলেন তোমার মাতা। সর্বোপরি মায়ের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকার প্রসংগে আমাদের প্রিয় নবী মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) বলেছেন- মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশ্ত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্য় কেবলমাত্র পিতা-মাতার সাথেই সদাচরণ তথা সদ্ব্যবহার এবং তাঁদের সেবা-যতœ করার জন্যই নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বরং ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, এতিম-মিসকিন, অসহায় মুসাফির এমনকি নিজের অধীনস্ত দাস-দাসী তথা কাজের লোকদের প্রতিও সদয় ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মানবতার মুক্তির মহান দূত এবং আমাদের প্রিয় নবী বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) যখন নবুয়ত প্রাপ্ত হন, তখন তাঁর গর্ভধারিণী মা বেঁচে ছিলেন না। বেঁচে ছিলেন তাঁর দুধমাতা হযরত হালিমা (রাঃ)। মহানবী (সঃ) তাঁর দুধমাতা হযরত হালিমা (রাঃ)-এর সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। একদা মহানবী (সঃ) তাঁর সাহাবীগণকে নিয়ে বসে ছিলেন। এমন সময় হযরত হালিমা (রাঃ) আগমন করলেন। মহানবী (সঃ) তাঁকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং তাঁর নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে দিয়ে হযরত হালিমা (রাঃ) কে বসতে দিলেন। অর্থাৎ মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) মাকে সম্মান করা শেখালেন। ইসলামের নবী এবং আমাদের প্রিয় নবী মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এভাবেই মাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। মায়ের সম্মান-মর্যাদা ও অধিকার প্রসংগে যে কেবলমাত্র পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ্তেই কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তাও কিন্তু নয়; বরং আমাদের সমাজের লোকজনের মুখে মুখেও হাজারো রকমের গান, কবিতা, ছড়া, প্রবাদ প্রভৃতি প্রচলিত রয়েছে। যেমন- মাগো মা, ওগো মা, আমারে বানাইলা তুমি দিওয়ানা ... ...! মায়ের মত আপন কেহ নাই রে ... ...। মা নাই যার ত্রিভূবনে কিছুই নাই তার। দেখিলে মায়ের মুখ, ভুলে যাই সব দুঃখ! মাগো আমায় দাও সাজিয়ে ময়ূর পক্সিক্ষখানা। মাগো আমি আজকে তোমার শুনব না আর মানা। আবার কথায় কথায় আমরা প্রায় সকলেই বলে থাকি- মা আমার, জনম্ দুঃখীনি মা; নারীরা মায়ের জাতি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের জাতীয় সংগীতেও মাকে সম্মান দিয়ে বলা হয়েছে- মা তোর মুখের বাণী আমার কাণে লাগে সুধার মত। মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন, ওমা আমি নয়ন জলে ভাঁসি ... ...। শুধু তাই-ই নয়, মাকে সম্মানিত করার উদ্দেশ্যে আমাদের দেশের বরেণ্য গীতিকার ও সুরকাররাও যেমন হাজারও রকমের কালজয়ী গান রচনা ও সুর করেছেন, তেমনি আবার দেশের বিখ্যাত সব শিল্পীরাও সে কালজয়ী গানগুলো (যেমন- মায়ের এক ধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম, জুতা বানাইলে ঋণের শোধ হবে না, আমার মা ... ...। মাগো তুই খোদা তা’আলার সেরা উপহার, মাগো তোর চরণ তলে বেহেশত আমার ... ...। মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না, দোহাই লাগে মাগো তুই আর কাঁদিস না ... ...। ইত্যাদি ইত্যাদি) অত্যন্ত দরদী গলায় গেয়ে মানুষের মন ভুলিয়েছেন, মানুষের মন জয় করেছেন, এমনকি মানুষকে কাঁদিয়েছেনও। সেই সাথে তাঁরা মাকে সবার শীর্ষে ও সবকিছুর উর্ধ্বে যেমন স্থান দিয়েছেন, তেমনি আবার মাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার আসনেও বসিয়েছেন। ইসলামে নারীকে সর্বদাই সুমাতা ও সুগৃহিনী হিসেবে তথা নারীর মাতৃরূপের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী শরিয়াহ্ তথা পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ্ যেমন মাকে সবার উপরে ও সবকিছুর উর্ধ্বে স্থান দিয়েছে, তেমনি সামাজিকভাবেও আমাদের দেশে মায়ের সম্মান-মর্যাদা সবার তথা সবকিছুর উপরে। সে কারণে দুনিয়ার সমস্ত কিছু দিয়েও মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না। অর্থাৎ মায়ের ঋণ অপরিশোধ্য। ইসলামী শরিআহ্ তথা পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্র দৃষ্টিতে মহান আল্লাহ্ তা’আলা এবং রাসুলুল্লাহ্ (সঃ)-এর পরপরই এ পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারিণী হলেন মা। ইসলামের মর্মবাণী তথা মাহাত্ম জেনে-বুঝেই সম্ভবত ম্যাক্সিম গোর্কি ‘মা’ উপন্যাস লিখেছেন এবং নেপোলিয়ান বলেছেন, “এরাব সব ধ মড়ড়ফ সড়ঃযবৎ, ও রিষষ মরাব ুড়ঁ ধ মড়ড়ফ হধঃরড়হ”- অর্থাৎ “আমাকে একজন ভালো মা দাও, আমি একটি ভালো জাতি উপহার দেবো”। মহান আল্ল¬াহ্ তা’আলার অফুরন্ত নিয়ামতরাজির মধ্যে সন্তানের প্রতি মায়ের নিখাদ, নিঃস্বার্থ ও চিরন্তন মায়া-মমতা ও ¯েœহ-ভালোবাসা মহান আল্ল¬াহ্ তা’আলার সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত তথা দান। সন্তানের প্রতি মায়ের মায়া-মমতা, ¯েœহ-ভালোবাসা, মাতৃত্ববোধ, মমত্ববোধ, ¯েœহবোধ ইত্যাদি যেমন নিখাদ, নিঃস্বার্থ এবং চিরন্তন, তেমনি মায়ের প্রতি সন্তানের শ্রদ্ধা-ভালোবাসাও কিন্তু স্বাভাবিকভাবে নিখাদ, নিঃস্বার্থ ও চিরন্তন হওয়া উচিত! কিন্তু বর্তমানকালে আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক বাস্তবতা কী সে রকমটা প্রমাণ করছে তথা করতে পারছে? আর আমরা নিজেরাও কী সে রকমটা করছি তথা করতে পারছি? নাকি পারছি না? অতীব দুঃখজনক হলেও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে যে, আমাদের ব্যক্তিগত নীতি-নৈতিকতা (ঢ়ৎরহপরঢ়ষবং) এবং পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধগুলোর (ংড়পরধষ াধষঁবং) চরম অবক্ষয়সহ পারিপার্শ্বিক নানাবিধ কারণে অবশ্য-অবশ্যই আমরা পারছি না! ফলে বয়সের ভারে ন্যুজ আমাদের পিতা-মাতারা বৃদ্ধ বয়সে সীমাহীন অযতœ-অবহেলা ও লাঞ্ছনা-গঞ্জনাসহ ভরণ-পোষণ এবং সুচিকিৎসার ক্ষেত্রে নানাবিধ বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছেন। এমনকি জীবন সায়াহ্নে এসে ছেলেমেয়েদের নিকট অনেকটা বোঝা হয়ে যাচ্ছেন! এবং নিরূপায় হয়ে অনেকেই আবার ‘বৃদ্ধাশ্রমে’ (ড়ষফ যড়সব) ঠাঁই নিয়ে নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে জীবন-যাপনও করছেন! আমরা মুসলিম, আর মুসলিম হিসেবে আমরা সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং কম-বেশি জানিও যে, মহিমান্বিত মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআনুল কারীম আমাদের (মুসলিমদের) পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা বা শাশ্বত জীবন-বিধান (পড়সঢ়ষবঃব পড়ফব ড়ভ ষরভব) তথা ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন (ঢ়ৎবংপৎরঢ়ঃরড়হ)। তবে সবকিছু জেনে-বুঝেও কেন জানি আমরা পবিত্র কুরআনুল কারীম অধ্যয়নও করছি না এবং মহান আল্লাহ্ তা’আলার আদেশ-নির্দেশগুলো বোঝার চেষ্টাও করছি না। ফলে মহান আল্লাহ্ তা’আলার আদেশ-নির্দেশ সম্পর্কে যেমন বুঝতে পারছি না, আর না বোঝার কারণে তেমনি আবার মেনে চলতেও পারছি না। আর মেনে চলতে পারছি না বলেই কিন্তু দিন দিন আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ক্ষেত্রে নতুন নতুন ধরনের নানামুখী সমস্যা, বিপত্তি ও বিশৃঙ্খলার উদ্ভব হচ্ছে! অর্থাৎ পবিত্র কুরআনুল কারীম অধ্যয়ন করছি না এবং ইসলামী অনুশাসন মেনে চলতে পারছি না বলেই কিন্তু শতকরা ৯০ জন মুসলিম অধ্যুষিত আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহ্র মৌলিক বিধি-বিধানের পরিপন্থী এবং পশ্চিমা বিশ্বের মস্তিস্ক প্রসুত ‘বৃদ্ধাশ্রম’ স্থাপন করার মত অদ্ভুত ধরনের চিন্তা-ভাবনাও করতে হচ্ছে! আবার স্কুলে স্কুলে মায়ের পা ধুয়ে দিয়ে “মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভক্তি-শ্রদ্ধা শীর্ষক কর্মসূচি’র” মত অদ্ভুত টাইপের হাস্যকর কর্মসূচিও পালন করতে হচ্ছে! এমনকি ‘ভালোবাসা দিবস’, ‘মা দিবস’, ‘বাবা দিবস’ ‘বন্ধু দিবস’, ‘নারী দিবস’ ইত্যাদি অদ্ভুত ও উদ্ভট টাইপের এবং আজগুবি কিসিমের সব হাস্যকর দিবসও পালন করতে হচ্ছে। আর অতি উৎসাহের সাথে অত্যন্ত হৈ-হুল্লড় করে উদ্ভট টাইপের ও আজগুবি কিসিমের এসব দিবস আবার আমরা পালন করছিও! সর্বোপরি বৃদ্ধ ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ দেয়া বাধ্যতামূলক’ করে আমাদের সরকারকে মহান জাতীয় সংসদে আইনও পাশ করতে হয়েছে! কাজের কাজ কতটা হচ্ছে কি না তা অবশ্য আমরা জানিনা? নারীরা সুমাতা ও সুগৃহিনী না হওয়ার কারণে পরিবারে যে কি রকম ভয়াবহ দুর্দশা, মারাত্মক বিপর্যয় ও ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসতে পারে এবং সুখী, সমৃদ্ধশালী ও নিরাপদ পরিবার যে কতটা ভয়ঙ্কর, বিপজ্জনক ও অনিরাপদ হতে পারে কিছুদিন পূর্বে পুলিশ দম্পতির আদরের কন্যা ঐশী নামক মেয়েটি কর্তৃক তারই পিতা-মাতাকে নির্মম ও মর্মান্তিকভাবে হত্যা করার ঘটনাটির মাধ্যমেই দেশবাসী তার নিষ্ঠুরতম প্রমাণ পেয়েছে। তাছাড়া নারীরা সুমাতা ও সুগৃহিনী না হওয়ার কারণে বর্তমানকালে আমাদের সমাজের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা মরণ নেশা মাদকে আসক্ত হচ্ছে। আর মাদকাসক্ত ও নেশাগ্রস্ত হয়ে যেমন তারা উশৃঙ্খল জীবন-যাপন করছে, তেমনি ইভ-টিজিং, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, রাহাজানি প্রভৃতি ভয়ঙ্কর সব অসামাজিক কার্যকলাপ ও নানাধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে ক্রমেই আমাদের সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ছে। আর পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়ার কারণে নানামূখী বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়ে দিন দিন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই সুখী, সমৃদ্ধশালী, নিরাপদ ও শক্তিশালী পারিবারিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসলামে নারীর মাতৃরূপের উপরই সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামে চাওয়া হয়েছে, নারী হবে সুমাতা ও সুগৃহিনী। তাই আসুন, “মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভক্তি-শ্রদ্ধা শীর্ষক কর্মসূচি’র” মত অদ্ভুত টাইপের হাস্যকর কর্মসূচিসহ অতি উৎসাহের সাথে অত্যন্ত হৈ-হুল্লড় করে ‘ভালোবাসা দিবস’, ‘বন্ধু দিবস’, ‘নারী দিবস’, ‘বাবা দিবস’, ‘মা দিবস’ ইত্যাদি অদ্ভুত ও উদ্ভট টাইপের এবং আজগুবি কিসিমের সব হাস্যকর দিবস পালন না করে; বরং পবিত্র কুরআন-হাদীস অধ্যয়ন করি, ঐশীবাণী কুরআন-হাদীসের আলোকে ইসলামকে বুঝি এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীসের আলোকে সুমাতা ও সুগৃহিনী হিসেবে মায়ের সম্মান-মর্যাদা এবং অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করি। সেই সাথে পিতা-মাতার সেবা করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করি, নিজেরা ধন্য হই- এই হোক আমাদের ব্রত। মহান আল্লাহ্ তা’আলা আমাদের সহায় হোন- আল্লাহুম্মা আমীন। লেখক ঃ গবেষক ও কলামিস্ট এবং প্রভাষক, প্রাণিবিজ্ঞান, কাউনিয়া কলেজ, কাউনিয়া, রংপুর। ঊ-সধরষ : ফৎসড়ষষধয৬৮@মসধরষ.পড়স ।
শেয়ার করুন :